kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

দেশে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের তোড়জোড়

আইসিডিডিআরবি অপেক্ষায় আছে—কবে চীন থেকে সিনোভ্যাক কম্পানির ভ্যাকসিনের নমুনা দেশে এসে পৌঁছবে। এর পরই তারা এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরুর জন্য তালিকাভুক্ত সাতটি হাসপাতালে শুরু করবে মূল কার্যক্রম। এ ব্যাপারে এরই মধ্যে হাসপাতালগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা শেষ করেছে আইসিডিডিআরবি। তবে হাসপাতালগুলোতে কার কার ওপর ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে, সেই তালিকা এখনো তৈরি হয়নি। কোনো কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের সব চিকিৎসক-নার্স-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিষয়টি অবহিত করে প্রস্তুত থাকতে বলেছে। আবার কোনো কর্তৃপক্ষ ঠিকভাবে বিষয়টি জানায়নি সবাইকে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল বুধবার একাধিক হাসপাতালে কিছু স্বাস্থ্যকর্মী ওই ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের জন্য টাকা বরাদ্দ বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি), আইসিডিডিআরবিসহ সংশ্লিষ্ট সব পর্যায় থেকে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে—এই ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া হবে না বা প্রটোকলেও এমন কিছু নেই। যাঁরা বিনা মূল্যে স্বেচ্ছায় ট্রায়ালে অংশ নিতে রাজি থাকবেন, শুধু তাঁদেরই প্রটোকল অনুসারে অন্য বিষয়গুলো মেনে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য নাম তালিকাভুক্ত করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের একজন চিকিৎসক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমেরিকায় যারা করোনার ভ্যাকসিন নিয়েছে তারা নাকি ১০০ ডলার করে পেয়েছে। সঙ্গে একটি পালস অক্সিমিটার, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ আরো কিছু জিনিস পেয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে যারা ভ্যাকসিন নেবে, তাদেরকে নাকি কিছুই দেওয়া হবে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে আমরা এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে আছি।’

মুগদা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘একটি টেলিভিশন চ্যানেলে টক শোতে দেখলাম, ট্রায়ালের টাকা-পয়সা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বক্তা। ফলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় তৈরি হচ্ছে। আমরা তো বিনা টাকায়ই ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী।

তবে যদি আড়ালে কোনো বরাদ্দের বিষয় থাকে, সেটা তো পরিষ্কার হতে হবে।’

এ বিষয়ে বিএমআরসির পরিচালক ডা. মাহমুদ উজ জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, সিনোভ্যাক ভ্যাকসিন ট্রায়ালের প্রটোকলের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণকারী কাউকে নগদ কোনো টাকা দেওয়ার অপশন নেই। এথিক্যাল (নৈতিক) কারণেই এটা হওয়া উচিত নয়। যাঁরা ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেন, তাঁরা স্বেচ্ছায় নিবেদিতপ্রাণে এই কাজে অংশ নেবেন। তবে প্রটোকলের আওতায় তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা, পরিবহনের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হবে বলে শর্ত দেওয়া আছে। যদি কারো বড় কোনো ক্ষতি হয়, সেই ক্ষতিপূরণের একটি বিষয়ও রয়েছে।

আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. কে এম জামানও বলেন, ‘আমরা স্বেচ্ছাসেবকদেরই এই কাজে নিচ্ছি। টাকার বিনিময় হলে তো আর স্বেচ্ছাসেবা হয় না। টাকার বিনিময় হলে সেটা এক ধরনের প্রলোভন বা প্রলুব্ধ করা হয়; কিন্তু এই কাজে এমন কিছু করার সুযোগ নেই।’ কোনো কোনো দেশে টাকা দেওয়া হয় বলে যে প্রশ্ন উঠেছে, সে বিষয়ে এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘এটা অনেক সময় আমরা দেখেছি যে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের সিস্টেম থাকে কখনো কখনো। বিশেষ করে যখন ভ্যাকসিন দিতে আসা কারো নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা বা পরিবহন খরচের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রটোকলে অন্তত এমন কিছু নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপের (নাইট্যাগ) একজন সিনিয়র সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, টাকার প্রশ্ন তোলা কোনোভাবেই ঠিক নয়। তবে যাঁরা ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেন তাঁদের ওপর পর্যবেক্ষণ যেন সুচারুভাবে চলে, সেটা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। এ ছাড়া অন্য যে সুবিধাগুলো দেওয়ার রেওয়াজ আছে, সেগুলো দিতে হবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রবিবার রাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের একটি টক শোতে ডা. সায়ন্ত নামের একজন টাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই মহৎ উদ্যোগ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এর পর থেকেই আমাকে এ বিষয়ে আরো অনেকে প্রশ্ন করেছেন আজ (গতকাল)। কিন্তু আমি জানি, সবাই স্বেচ্ছাসেবায় এই ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এখানে টাকা-পয়সা লেনদেনের কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না নৈতিক কারণেই।’

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসিরউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আমাদের এখানকার স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছি। আমাদের নিজস্ব একটি এথিক্যাল কমিটি রয়েছে, তারা বিষয়টি দেখভাল করছে। ফলে অনৈতিক কিছু হবে না বা কেউ প্রাপ্য নৈতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিতও হবে না বলেই বিশ্বাস করি।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ বলেন, ‘আমার এখানে প্রায় এক হাজার ২০০ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। ইতিমধ্যে আমি সবাইকে ভ্যাকসিন নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য উৎসাহ জুগিয়েছি; যাদের মধ্য থেকে করোনা পজিটিভ ও গর্ভবতী নারী কর্মীদের বাদে প্রায় এক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে এই ভ্যাকসিনে নেবে বলে আশা করছি।’

তবে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ কে এম সারোয়ারুল আলম বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবহিত আছি। তবে এখনো ফাইনাল কোনো তালিকার কাজ শুরু হয়নি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা