kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

কার্টিজ পেপারের দাম ৩০ গুণ বেশি

আমদানি বন্ধ থাকায় সংকট বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি

আশরাফ-উল-আলম   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কার্টিজ পেপারের দাম ৩০ গুণ বেশি

ঢাকার নিম্ন আদালতে কার্টিজ পেপার সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে ৩০ গুণ বেশি দামে তা কিনতে হচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে মামলার খরচ, ব্যাহত হচ্ছে মামলা পরিচালনা। জটিলতায় পড়ছেন বিচারপ্রার্থীসহ আইনজীবীরা। সংকট সমাধানে দ্রুত কার্টিজ পেপার সরবরাহের দাবি জানিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।

কার্টিজ পেপার এক ধরনের বিশেষ কাগজ। হলুদ বর্ণের এই কাগজ আদালতে আরজি, জবাব, বিভিন্ন দরখাস্ত দাখিল এবং ভূমি হস্তান্তরের দলিল লেখার কাজে ব্যবহূত হয়। চুক্তিপত্র করতে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের সঙ্গেও কার্টিজ পেপার সংযুক্ত করতে হয়।

এই কার্টিজ পেপার সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। সরকারিভাবে প্রতিটি কার্টিজের মূল্য দুই টাকা। বর্তমানে আদালতে সরবরাহ নেই—এই অজুহাতে প্রতিটি কার্টিজ পেপারের দাম নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা। কখনো কখনো আরো বেশি দামে এসব কার্টিজ পেপার কেনা হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের টাকা দিয়ে।

মামলা দায়েরে কার্টিজ পেপার কিনতে এসে দর-কষাকষিতে জড়িয়ে পড়েন আইনজীবীরা। এই চিত্র এখন ঢাকার নিম্ন আদালতপাড়ায়। গত প্রায় এক বছর ধরে এমন দাম উঠেছে কার্টিজ পেপারের। পেপার না পাওয়ায় বিকল্প কাগজ ব্যবহারে ঝুঁকছেন আইনজীবীরা। কিন্তু সমাধান মিলছে না। কার্টিজের পরিবর্তে পাঁচ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ নীল কাগজ ব্যবহার করছেন। কার্টিজ পেপার একটু মোটা ধরনের কাগজ। নীল কাগজ অপেক্ষাকৃত হালকা। এই কাগজ খুব দ্রুত নষ্ট হয় বা ছিঁড়ে যায়। আদালতে মামলা চলে দীর্ঘদিন। নথির কাগজ নষ্ট হয়ে গেলে মামলার অনেক তথ্যই নষ্ট হয় বলে জানান আইনজীবীরা।

আইনজীবীরা জানান, আগে কার্টিজ পেপার পাঁচ থেকে আট টাকায় কেনা যেত। এখন পাওয়াই যায় না। দুই-একটি ভেন্ডারের দোকানে পাওয়া গেলে তার মূল্য ১২ গুণের বেশি। কার্টিজ পেপার সংকটে বেড়েছে মামলা পরিচালনার খরচ। বিচারপ্রার্থীদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।

আইনজীবীরা জানান, কোনো কোনো আদালতে কার্টিজ পেপার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। সে ক্ষেত্রে বাড়তি যে টাকা লাগে তা মূলত বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকেই নিতে হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের ট্রেজারি বিভাগের মাধ্যমেই কার্টিজ পেপার ভেন্ডরদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ভেন্ডররা কেন মূল্য বেশি নিচ্ছেন তার কোনো সদুত্তর দিতে পারছে না ট্রেজারি বিভাগ।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের ট্রেজারি শাখার উচ্চমান সহকারী আবদুল কাদের ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কার্টিজ পেপার সরবরাহ নেই। এটি সরকার বিজি প্রেসের মাধ্যমে ট্রেজারি অফিসে সরবরাহ করে। জানা গেছে, বিদেশ থেকেও ঠিকাদাররা আমদানি করতে পারছে না। সর্বশেষ ২০১৮ সালের শেষদিকে কার্টিজ পেপার সরবরাহ হয়। এরপর আর সরবরাহ নেই। ভেন্ডররা যাঁরা আগে কিনে রেখেছিলেন তাঁরা এখন বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ বিষয়ে ট্রেজারি অফিস থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খান রচি কালের কণ্ঠকে বলেন, কার্টিজ পেপারের দাম অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কার্টিজ পেপার সরবরাহ করতে পারছে না। তবে এ বিষয়ে আইনজীবী সমিতি দাবি জানিয়েছে কার্টিজ পেপারের বিষয়টি সমাধান করার। বেশি দামে কার্টিজ পেপার কেনা হচ্ছে, এটা বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়। এটা বিচারপ্রার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ। তিনি আরো বলেন, ‘আশা করি বিষয়টির সমাধান শিগগিরই হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আবুল বাশার বলেন, ৬০-৭০ টাকা করে কার্টিজ পেপার কিনতে হচ্ছে। বিচারপ্রার্থীদের পকেট থেকে এই টাকা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কার্টিজ পেপারই প্রয়োজন। এর বিকল্প নেই। তাই বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আবার অনেক ভেন্ডারের কাছে কোনো কার্টিজ নেই। এই সংকট সমাধানের কোনো চেষ্টাও নেই।

শুধু আদালত এলাকায় কার্টিজের সংকট তা নয়, ঢাকাসহ সারা দেশেই কার্টিজের এমন সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকার রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স তেজগাঁওয়ে গিয়ে দেখা গেছে, স্ট্যাম্প ভেন্ডরদের অনেকেই প্রতিটি কার্টিজ পেপার ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন। একইভাবে দৈনিক বাংলার মোড়, বায়তুল মোকাররমের উল্টোদিকের রাস্তার ফুটপাতে এবং প্রেস ক্লাবের উত্তর দিকে ও সুপ্রিম কোর্টের স্ট্যাম্প ভেন্ডরদের দোকানেও একই চিত্র দেখা গেছে। ভূমি অফিসগুলোতে কর্মচারীরা কার্টিজ পেপার রেখে বিক্রি করেন। এসব কার্টিজ পেপার প্রতিটি ১০০ টাকা করে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকার একজন ভেন্ডর নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, কার্টিজ পেপারের সংকট এখন চরমে। ভেন্ডরদের প্রায় কারো কাছেই কার্টিজ পেপার নেই। যাঁদের কাছে কিছু আছে তাঁরা চড়া দামে বিক্রি করছেন। তিনি জানান, সনদধারী স্ট্যাম্প ভেন্ডররা সরকারি চালানে টাকা জমা দিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে স্ট্যাম্প ও কার্টিজ সরবরাহ পান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা