kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

সন্ধ্যার আগেই ঝাঁপ ফেলেন শ্রীপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

► তিন বছর আগের স্বর্ণের দোকানে লুটপাটের মামলার কিনারা হয়নি
► একই কায়দায় গত সপ্তাহে লুটপাট হলেও এখনো তদন্তে অগ্রগতি নেই

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্ধ্যার আগেই ঝাঁপ ফেলেন শ্রীপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

২০১৬ সালের আগস্ট মাসে গাজীপুরের শ্রীপুরে ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র মাওনা চৌরাস্তায় একটি স্বর্ণের দোকান লুট হয়েছিল। ওই সময় সন্ধ্যার দিকে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদল মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে লুট করেছিল ৩৩১ ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন চারজন। এর প্রায় সাড়ে তিন বছর পর একই কায়দায় গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে লুট হয়েছে আরো দুটি স্বর্ণের দোকান।

প্রথম ঘটনাটির কোনোই কূলকিনারা করতে পারেননি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। মামলাটি এখন অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) তদন্তাধীন। নানা কারণে চার দফা তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছে সেখানে। শেষ পর্যন্ত তদন্তে তেমন কিছুই না পেয়ে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা।

ফলে দ্বিতীয় ঘটনাটির পর চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ীরা। আতঙ্কে সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন তাঁরা। এতে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ীদের।

এদিকে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দুটি স্বর্ণের দোকান লুট হওয়ার দুই দিন পার হলেও দুর্বৃত্তদলের কোনো সদস্যকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই পাইনি। চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ইয়াকুব আলী মাস্টার প্লাজার দোতলায় সঙ্গীতা জুয়েলার্স লুট হয় ২০১৬ সালে। ওই ঘটনায় দোকানটির স্বত্বাধিকারী শংকরচন্দ্র দাস শ্রীপুর থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন শ্রীপুর থানার তখনকার এসআই আজাহার হোসেন। কিন্তু কোনো অগ্রগতি না থাকায় পরের বছরই মামলাটি গাজীপুরে সিআইডিতে স্থানান্তর হয়। সেখানে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন তখনকার পরিদর্শক মহিউদ্দিন আহমেদ। প্রায় কয়েক মাস তিনি তদন্ত করলেও দুর্বৃত্তদলকে শনাক্ত করতে পারেননি। তাঁর বদলির পর তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন তখনকার পরিদর্শক জাফর ইকবাল। বছরখানেক তিনিও তদন্ত করেছেন। জাফর ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বগুড়ায় কয়েকজন ডাকাত ধরা পড়েছিল। ওই দল থেকে তিনজনকে শনাক্তও করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশ চেয়েও পাইনি।’ মামলার তদন্তকাজ চলার সময়ই তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটি নেন। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন পরিদর্শক মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের পুবাইলে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। শেষ পর্যন্ত মামলার তদন্তকারী নিযুক্ত হয়েছেন উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেলচন্দ্র সরকার।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে এসআই সোহেলচন্দ্র সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্তে কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

এদিকে লুট হওয়া সঙ্গীতা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শংকরচন্দ্র দাসের ছেলে সুব্রতচন্দ্র দাস জানান, মামলার তদন্তে গতি আনার জন্য তাঁর বাবা দুই দফা পুলিশের তখনকার মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গেও দেখা করেছেন। দুই দফা দেখা করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখলেও মামলার অগ্রগতি চোখে পড়েনি। দুঃখ প্রকাশ করে সুব্রতচন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন আশাই ছেড়ে দিয়েছি।’

এদিকে গত শুক্রবার একই দুঃসাহসিক কায়দায় ব্যস্ততম ব্যবসাকেন্দ্র জৈনাবাজার এলাকার নিউ দীপা জুয়েলার্স ও লক্ষ্মী জুয়েলার্স লুট হয়। ওই সময় গুলিবিদ্ধ হন নিউ দীপা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী দেবেন্দ্রচন্দ্র দেবু। তিনি জানান, দুর্বৃত্তদল দুটি দোকান থেকে নগদ পৌনে পাঁচ লাখ টাকাসহ ৮০ ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার ও ৫০০ ভরি রুপা লুট করে। ঘটনার পরদিন শ্রীপুর থানায় মামলা করেন তিনি। কিন্তু ঘটনার দুই দিন পার হলেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্বৃত্তদলের কোনো সদস্য শনাক্ত কিংবা মাল উদ্ধার সম্ভব হয়নি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার এসআই শহিদুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘প্রকাশযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ তবে থানার ওসি মো. লিয়াকত আলী দাবি করেন, ‘খুব দ্রুতই দুর্বৃত্তদলের সকল সদস্যকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে।’

এদিকে প্রথম ঘটনায় দুর্বৃত্তদলকে শনাক্ত করতে না পারা ও ফের একই কায়দায় দুটি দোকান লুটের ঘটনায় উপজেলার স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রথম ঘটনাটির দুর্বৃত্তদলের সব সদস্যকে শনাক্তসহ গ্রেপ্তার ও মাল উদ্ধার সম্ভব হলে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটত না।

সঙ্গীতা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শংকরচন্দ্র দাসের ছেলে সুব্রতচন্দ্র দাস দাবি করেন, তাঁদের বাড়তি কোনো নিরাপত্তা নেই। ভয়ে তাঁরা স্বর্ণালংকার প্রদর্শনও করতে পারছেন না। ফলে বিক্রিও কমে গেছে। সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ করে ফেলছেন তাঁরা।

মাওনা কিতাব আলী প্লাজার প্রথম তলায় অবস্থিত বি বি জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী বিল্লাল বেপারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ করে ফেলি। দিনেও ভয় হয়।’

এদিকে দ্বিতীয় ঘটনায় স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ীরদের আতঙ্কিত হয়ে পড়ার বিষয়ে শ্রীপুর থানার ওসি মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক পুলিশের একাধিক টিম টহলে থাকে। এ ছাড়া ওই ঘটনার পর নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা