kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইলিশের সর্বনাশ আর নেতাদের পৌষ মাস

শিকারে নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে না

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইলিশের সর্বনাশ আর নেতাদের পৌষ মাস

চলছে ইলিশের প্রজনন মৌসুম। মা ইলিশ যাতে নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে সে জন্য চলতি মাসের ৮ তারিখ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত নদী ও বঙ্গোপসাগরের সংশ্লিষ্ট এলাকাজুড়ে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জেলা প্রশাসন সার্বিক চেষ্টা করছে। কিন্তু থেমে নেই মা ইলিশ শিকার। কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় নদীতে চলছে ইলিশ শিকার। আবার কোস্ট গার্ডের উপস্থিতিতেও চলে ইলিশ শিকার। গত বুধবার পর্যন্ত টানা তিন দিন সরেজমিনে পটুয়াখালী জেলার তেঁতুলিয়া নদীর কয়েকটি পয়েন্টে এমন চিত্র দেখা গেছে।

নিমদি : গত বুধবার দুপুরে বাউফল উপজেলার নিমদি লঞ্চঘাট থেকে কোয়ার্টার কিলোমিটার দক্ষিণে তেঁতুলিয়ায় ভেঙে যাওয়া রাস্তার ওপর দেখা গেল শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই একাধিক ব্যক্তি বলে উঠল, ‘ভাই, দ্যাহেন ক্যামনে ইলিশ ধরে।’ ওই সময় সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে ১২টি নৌকায় জেলেরা পেতে রাখা ইলিশ ধরার জাল তুলছে তেঁতুলিয়া নদী থেকে। অথচ নিমদি লঞ্চঘাটে নোঙর করে আছে কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘পাবনা’। দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিটে ওই জাহাজের পাশ দিয়েই জাল নিয়ে নৌকায় ছোটে জেলেরা নদীর পূর্ব পারের দিকে। দুপুর ১টা ৩ মিনিটে দেখা গেল, নিমদি লঞ্চঘাটের প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে বড় ডালিমা এলাকায় তেঁতুলিয়ার বুকে জাল টানছে জেলেরা। স্থানীয় লোকজন জানায়, জেলেরা নদীতে জাল ফেলে তেঁতুলিয়ার পূর্ব পারে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরের ছোট ছোট খালে নৌকায় আশ্রয় নেয় এবং সময় হলে জাল ওঠায়। এদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কিছু অসাধু নেতার যোগসাজশ রয়েছে। ইলিশ প্রজননের এই নিষেধাজ্ঞার সময় সংঘবদ্ধ চক্রটি অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করে কোটি কোটি টাকা আয় করে। নেতাদের নাম জানতে চাইলে বলে, ‘সবাই তাদের নাম জানে। আমরা নাম বললে এলাকাছাড়া করব। বোঝেন না, কোস্ট গার্ড কিছু বলে না কেন?’

কোস্ট গার্ডের জাহাজটির অফিসার ইনচার্জ ওবায়দুল হক বলেন, ‘নিমদি লঞ্চঘাট এলাকায় আমাদের জাহাজ নোঙর করা থাকে ঠিকই, কিন্তু আমরা স্পিডবোট নিয়ে অন্যত্র অভিযানে থাকি। আর এই সুযোগ জেলেরা কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে।’      

পানপট্টি : গলাচিপার পানপট্টি পয়েন্টে মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে এক ঘণ্টা অবস্থানকালে দেখা গেছে, নৌকা ও ট্রলার নোঙর করে আছে পানপট্টি লঞ্চঘাটের উত্তর পাশে। সব নৌকায় রয়েছে জাল। এ সময় তিনটি নৌকা নিয়ে জেলেদের মাছ শিকার করতে দেখা যায়। এ ছাড়া একটি ট্রলার মাছ শিকারের জন্য উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে আগুনমুখা নদী অভিমুখে যেতে দেখা যায়।

পানপট্টি এলাকার শফিক নামের এক জেলে বলেন, ‘আতে (হাতে) টাহা নাই, বারতে (বাড়িতে) বাজার নাই। পোলাপাইন আর সংসার বাঁচাইতে ঠেইক্যা এই চুরি করি স্যার। অনেকে আছে নেতাগো শেল্টারে ইলিশ ধরে। হ্যাগো অভাব নাই। নেতারা স্যার এই অবরোধের কালে (সময়) লাখ লাখ টাহা কামাই কইরগ্যা নেয়।’

নাজমুল মৃধা নামের আরেক জেলে বলেন, ‘প্রশাসন অভিযানে নামলে মৎস্য অফিসের এক লোক আগেই খবর দেয়। তহন আমরা নদীতে থাহি না। আমরা আর কী পাই, নেতারাই সব খায়। হেরাই প্রশাসন গুছ (ম্যানেজ) কইরগা লয়।’

বদনাতলী : মঙ্গলবার দুপুর ২টা থেকে দেড় ঘণ্টা গলাচিপার বদনাতলী লঞ্চঘাটে অবস্থান করে দেখা গেছে একই চিত্র। তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ শিকারে তৎপর পাঁচটি নৌকা। তেঁতুলিয়ার বুক থেকে নৌকায় জাল তুলছে জেলেরা। আর লঞ্চঘাটের দুই পাশে তিনটি ট্রলার ও চারটি মাছ ধরার নৌকা নোঙর করে আছে। স্থানীয় সেকান্দার মৃধা বলেন, ‘সরকারি লোকজন নদীতে দেহা যায় না। ইলিশের সর্বনাশ অইলেও রাজনীতি করা কিছু নেতার পৌষ মাস চলছে। নেতাগো নাম আমি কমু ক্যা? নাম কইলে বালা (বিপদ) আমার কান্দে ওডবে। জাইল্লারা গরিব ঠিকই, অসভ্য না। অরা না খাইয়া থাহে, তবু জেল-জরিপানার (জরিমানা) লগে জড়াইতে চায় না। নেতারা চাইলে ইলিশ ধরা বন্ধ অইবে।’    

বাঁশবাড়িয়া ও ভুতুমচর : দশমিনা উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর বাঁশবাড়িয়া ও ভুতুমচর এলাকায় সোমবার সকাল ১১টায় ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় ১২টি নৌকা দিয়ে জেলেরা ইলিশ শিকার করছে। বাঁশবাড়িয়ার হানিফ গাজী বলেন, ‘দশমিনার জেলেরা সাহস করে নদীতে নামে না। যেসব নৌকা দেখেন সব ভোলার। বিশেষ করে ভোলার লালমোহন উপজেলার গাইমারা ও পেশকার বাজার এলাকার জাইল্লারা দিনে-রাইতে ইলিশ শিকার করে নেয়।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও নিষেধাজ্ঞা না মানার তথ্য এদিকে নিষেধাজ্ঞা না মানায় জেলেদের জেল-জরিমানা করা অব্যাহত রয়েছে। জেলা মৎস্য অফিসের গত বুধবারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এরই মধ্যে ৯৭টি অভিযানে ৫৮টি মোবাইল কোর্ট বসানো হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে এক হাজার ৭৬৩ কেজি ইলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৩৮৪ মিটার জাল। এসব ঘটনায় ৫১টি মামলা করা হয়েছে। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক জেলেদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৭৯ হাজার টাকা এবং ৩৪ জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।  

জেলা মৎস্য অফিসের উপসহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘জনবল ও যানবাহনের সংকট এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে নিষেধাজ্ঞার সময় নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকার বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, রাজনৈতিক নেতারাই পারেন মা ইলিশ শিকার বন্ধ করতে। তাঁদের কথাই জেলেরা শোনে। তাঁরা মাঠ পর্যায়ের নেতা, নদী-নালা আর মাঠঘাট তাঁরাই নিয়ন্ত্রণ করেন। আমাদের এই চেষ্টা নামমাত্র।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা