kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শাহজালালে চার মাসে ২৪২ লাগেজ চুরি

এয়ারলাইনসের গাফিলতিতে পার পাচ্ছেন ‘লাগেজ চোর’ যাত্রীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এয়ারলাইনসের গাফিলতিতে পার পাচ্ছেন ‘লাগেজ চোর’ যাত্রীরা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ চুরির ঘটনায় যাত্রীদেরও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত চার মাসে ২৪২টি ঘটনার ১১টিতে বিদেশফেরত যাত্রীদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। এতে এয়ারলাইনসগুলোর গাফিলতি এবং বিমানবন্দরের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার অভাবকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁরা বলেছেন, বিমানবন্দরে লাগেজ আসার পর তা সঠিক যাত্রী নিচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্ব এয়ারলাইনসের। বের হওয়ার সময় সব যাত্রীর লাগেজ ট্যাগ মিলিয়ে না দেখা ও পরিবাহক বেল্টে (কনভেয়ার বেল্ট) এয়ারলাইনসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের নজরদারি না থাকার ফলে এমন ঘটনা ঘটছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি ৩৯টি এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করছে যাদের দিনে গড়ে ২৫০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এর মধ্যে ১৩০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা করছে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর তা থেকে মালামাল বিমানবন্দরে পরিবাহক বেল্ট (কনভেয়ার বেল্ট) পর্যন্ত আনার দায়িত্ব গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের। সেখানে সিসিটিভিসহ নজরদারি বাড়ানোয় অপরাধের পরিমাণ কমে এসেছে। কিন্তু বেল্ট থেকে মালামাল চুরি বেড়েই চলেছে।

আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশের (এপিবিএন) কর্মকর্তারা জানান, বিমানবন্দরে এখন নতুন অপরাধ হিসেবে দেখা যাচ্ছে এক যাত্রীর লাগেজ আরেক যাত্রী কর্তৃক চুরি করে নেওয়া। গত ২৭ জুলাই বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজের অপেক্ষায় ছিলেন ইতালি থেকে ফেরা এক বাংলাদেশি। কিছুক্ষণ পর লাগেজ নিয়ে সপরিবারে ত্যাগ করলেন বিমানবন্দর। আপাতদৃষ্টিতে এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরে সামনে এলো আসল ঘটনা। ওই ফ্লাইটে আসা বেলজিয়ামপ্রবাসী জাবের উদ্দিন তাঁর লাগেজ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন বিমানবন্দরে দায়িত্বরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কাছে।

জাবের উদ্দিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এপিবিএন দেখতে পায় একই দিনে ইতালিফেরত ওই যাত্রী বেলজিয়ামফেরত যাত্রীর লাগেজ নিয়ে গেছেন। যোগাযোগ করলে প্রথমে তিনি অস্বীকার করলেও পরে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখানো হলে লাগেজ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে লাগেজের মালামাল ফেরত দিলেও সরিয়ে ফেলেন সেখানে থাকা প্রায় ৪০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৮ লাখ টাকা)। অবশ্য চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হন তিনি।

জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার হাসান মাসুদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই দায় এয়ারলাইনসের। তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে না। এসবই আমাদের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। আমরা প্রায় দেখি রাতের ফ্লাইটে ঠিকমতো লাগেজ ট্যাগ চেক করা হয় না। কে কার লাগেজ নিয়ে যাচ্ছে তা দেখার কেউ নেই। এয়ারপোর্টে লাগেজ ট্যাগ ছাড়া কেউ কোনো লাগেজ পাবেন না—এই ঘোষণা দিয়ে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলেই রাতারাতি দৃশ্যপট বদলে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘লাগেজ চুরির সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত থাকেন। বড় বড় ফ্লাইটগুলো বেশির ভাগ রাতে আসে। একসঙ্গে ৩০০ লাগেজ এলেই সেটা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। আবার যাত্রীবেশী কিছু লোক টার্গেট করে লাগেজ নিয়ে যান। লাগেজ ট্যাগ চেক করার জন্য যে লোকবল তাও এয়ারলাইনসগুলোর নেই।’    

বর্তমানে কোনো যাত্রীর লাগেজ হারালে এয়ারলাইনসকে প্রতি কিলোগ্রামের জন্য ২০ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। মন্ত্রিসভায় সদ্য অনুমোদন হওয়া আকাশপথে পরিবহন আইন অনুযায়ী লাগেজ হারালে এয়ারলাইনসকে দিতে হবে এক হাজার ৪০৭ ডলার। ফলে লাগেজ চুরির ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে এয়ারলাইনসগুলোর। কিন্তু তারা পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ করছে না। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের জিএসএ (জেনারেল সেলস এজেন্ট) প্রতিষ্ঠানেরও সক্ষমতার অভাব থাকে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বিমানবন্দরে যাত্রীর লাগেজ চুরি দেশের ভাবমূর্তির জন্যও ভীষণ ক্ষতিকর বলে মনে করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মোমেন। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো যাত্রী যখন একটি টিকিট কিনে চেক ইন করে লাগেজটি এয়ারলাইনসকে দেন সেটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া এয়ারলাইনসের দায়িত্ব। মালামাল চুরি হলে তার দায় পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার। যাত্রীরাও যদি নিয়ে যায় এটা দেখার দায়িত্বও এয়ারলাইনসের।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা