আমরা বউমা ও শাশুড়ির প্রতি বিশেষ কিছু পরামর্শ তুলে ধরছি। প্রথমে আসা যাক, শাশুড়ির প্রতি বিশেষ পরামর্শ সম্পর্কে। শাশুড়ির প্রতি বিশেষ পরামর্শ একটাই—অন্তর প্রশস্ত করতে হবে। আর অন্তর প্রশস্ত করতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে।
১. বউমার ভুলচুক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে
দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের সমাজে অনেক শাশুড়ি আছেন, পুত্রবধূকে আপন করে নিতে পারেন না। তাকে বাড়ির সেবিকা বা চাকরানি মনে করেন। শাশুড়ি নিজের মেয়েকে এক চোখে দেখেন, পুত্রবধূকে ভিন্ন চোখে দেখেন। এ জন্য একটি ব্যাপার স্পষ্ট থাকা দরকার যে পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। সুতরাং এ জন্য তাকে শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন করতে পারবেন না; বরং আপনার উচিত অন্তর প্রশস্ত করা। তার ভুলচুক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। টুকটাক বিষয় নিয়ে বউমার সঙ্গে মতবিরোধ হতেই পারে। সে জন্য খামোখা ঝগড়াঝাঁটি করতে যাবেন না। চেষ্টা করুন তার মতকেও গুরুত্ব দিতে।
হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কাজের লোককে প্রতিদিন কতবার মাফ করব? তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রতিদিন তাকে তোমরা ৭০ বার মাফ করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৬৪)
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যেখানে খাদেম বা চাকরকে প্রতিদিন ৭০ বার মাফ করার কথা বলা হয়েছে, সেখানে এই মেয়েটি তো আপনার বউমা। আপনি বড়, সে ছোট। ভুল তো ছোটরাই করে। সুতরাং মাফ করে দিন।
২. পুত্র ও পুত্রবধূর সবকিছুতে নাক গলাবেন না
মনে রাখবেন, আপনার ছেলে এখন আপনার ছোট্ট বাবু নয়। সে এখন বড় হয়েছে। তার পার্সোনাল লাইফ আছে। আপনার পুত্র ও পুত্রবধূর দাম্পত্য জীবনে একে অন্যের প্রতি কিছু দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। এখন যদি আপনি এসব বিষয়েও নাক গলানো শুরু করেন, তাদের নিজেদের মতো করে দাম্পত্য জীবন উপভোগ করার স্পেস না দেন। যেমন—ছেলে তার স্ত্রীর জন্য কিছু আনলে আপনি যদি বলেন, এত দামিটা কেন আনল কিংবা আমার জন্য বা আমার মেয়ের জন্য কেন আনল না; অথবা ধরুন, ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে চায় আর আপনি এক্কেবারে ‘না’ করে বসলেন, তাহলে মনে রাখবেন, সুখ ও শান্তি আপনার ছাদের নিচে কক্ষনো আসবে না। সুতরাং তাদের এসব পার্সোনাল বিষয়ে আপনাকে ছাড় দিতে হবে।
আসলে উক্ত সমস্যার অন্যতম কারণ হলো ছেলেকে বিয়ে করানোর পর মা মনে করে, এই বুঝি ছেলে পর হয়ে গেল। বউমাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। আর বোধ হয় তাঁকে সেভাবে পাত্তাও দেবে না। ছেলের অধিকারবোধ নিয়ে তাঁরা আশঙ্কায় ভোগেন বিধায় এমনটি করে থাকেন। এ জন্য এ ক্ষেত্রে মায়ের উচিত অন্তরটাকে বড় করা।
৩. পুত্রবধূর ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করুন
কিছু শাশুড়ি আছে বউমার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করা তো দূরের কথা, বরং পদে পদে তার ভুল ধরতেই ব্যস্ত থাকেন। ছেলের কাছে বউয়ের নামে গোপনে দুর্নাম করেন। নুন থেকে চুন খসলে ছেলের কাছে বিচার দেন। নিজের মেয়েদের কাছে বলে বেড়ান। এমনকি বাইরের মানুষের সামনে অপদস্থ করেন। আর মেয়েদের কাছে বললে এটা তো স্বাভাবিক যে এ দুর্নামগুলো তাদের স্বামীর কানেও পৌঁছে। তখন বউয়ের জন্য প্রধান বিচারপতি বনে যায় মেয়ে কিংবা তার স্বামী! যার কারণে আমাদের সমাজের বেশির ভাগ ননদ তাদের ভাবিকে দাজ্জাল মনে করে। আর ভাবিরা ননদকে দাজ্জাল মনে করে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এটার জন্য অন্যতম দায়ী কিন্তু শাশুড়ি। অথচ শাশুড়ি যদি বউয়ের বদনাম না করে তার দোষগুলো গোপন করতেন এবং তার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করতেন, তাহলে পারিবারিক বিবাদ-কলহ অনেকাংশে কমে যেত। তাই শাশুড়িকে বলব, আল্লাহকে ভয় করুন। বউয়ের গিবত করা, তাকে অপবাদ দেওয়া থেকে দূরে থাকুন, তার দোষগুলো মায়ের মতো করে লুকিয়ে রাখুন, তার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করুন; দেখবেন, আপনার সংসারে অশান্তি থাকবে না।
৩. নিজের মেয়ে ও বউমাকে এক দৃষ্টিতে দেখুন
অনেক শাশুড়ি আছেন, ঘরে যদি কোনো অবিবাহিত মেয়ে থাকে তাহলে তার কোনো দোষ আছে বলে মনেই করেন না। মনে করেন, সব দোষ শুধু পুত্রবধূর। এটা জঘন্য অন্যায়।
মনে রাখতে হবে যে আইন দিয়ে জীবন-সংসার চলে না। একটু আগে বলেছিলাম, পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। এটা তো আইনের কথা। বাস্তবতা হলো আইনের রুক্ষ বাঁধনের ওপর ভিত্তি করে হয়তো ‘তালাক’ ঠেকানো যাবে—যদিও অনেক সময় তাও সম্ভব হয় না; কিন্তু সুখ-শান্তি কখনোই আসবে না। কেননা, এটা যেমন আইন, তেমনি এটাও আইন যে স্ত্রীকে তার মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া কিংবা ব্যবস্থা করে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়; বরং ইসলামী আইনজ্ঞরা এ পর্যন্তও বলেছেন, স্ত্রীর মা-বাবা সপ্তাহে মাত্র একবার আসবেন, তাও মেয়েকে দূর থেকে দেখে চলে যাবেন। তাঁদের ঘরে বসিয়ে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়।
সুতরাং আইনের এসব চৌহদ্দিতে পড়ে থাকা মানে অশান্তি ডেকে আনা; বরং বউমাকেও ভাবতে হবে যে তাকেও একদিন শাশুড়ি হতে হবে। হতে হবে বৃদ্ধা। আর বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রবধূর কাছ থেকে কিরূপ আচরণ প্রত্যাশা করে—এ প্রশ্ন নিজেকে করলে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে কেমন আচরণ করবে তার জবাব সে পেয়ে যাবে।
বউমার প্রতি বিশেষ পরামর্শ
পারিবারিক সুখ-শান্তি যেন বিনষ্ট না হয় এ লক্ষ্যে বউমার প্রতি সংক্ষেপে কিছু বিশেষ পরামর্শ পেশ করছি। যদি মানতে পারেন তাহলে ইনশাআল্লাহ শ্বশুরকে ‘বাবা’ এবং শাশুড়িকে ‘মা’ হিসেবে পাবেন।
১. শ্বশুর-শাশুড়ির আনুগত্য ও সেবা করুন
সুখের নীড় রচনা করতে হলে পুত্রবধূর উচিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে যতটুকু সম্ভব শ্বশুর-শাশুড়ির খিদমত করা। একে নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করা। দুঃখজনক হলো আজকাল এমন নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যাঁরা বিয়ের পর শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে আর থাকতে চান না বা তাঁদের সেবা করা নিজেদের ওপর জুলুম মনে করেন। অনেকে শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে স্বামীকে তাঁর মা-বাবার বিরুদ্ধাচরণ করতে উসকানি দেন। উদ্দেশ্য হলো, শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন জীবন যাপন করা অথবা শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা থেকে অব্যাহতি পাওয়া।
অথচ ওই নারীই একসময় যখন আরেকজন মেয়ের শাশুড়ি হন, তখন চান নিজের পুত্রবধূ তাঁর ভালোমন্দ খোঁজখবর নিক। সেবাযত্ন করুক। তাঁদের পাশেই থাকুক। এটা সম্পূর্ণ দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’
(মুসলিম, হাদিস : ৪৫)
২. শ্বশুরবাড়ির বদনাম বাবার বাড়িতে করবেন না
আপনার শ্বশুরবাড়ি হলেও সেটি আপনার স্বামীর নিজের বাড়ি। তা ছাড়া বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই হয়ে যায় নিজের বাড়ি। আর নিজের বাড়ির বদনাম কেউ সহ্য করতে পারে না। তাই শ্বশুরবাড়ির বদনাম করলে আপনার স্বামী রেগে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সেই বাড়ির সব সদস্য তাঁর আপনজন। তাই শ্বশুরবাড়ির বদনাম করবেন না। যদি সুযোগ পান তবে প্রশংসা করুন। এতে আপনার স্বামী খুশি থাকবেন। ভালো থাকবে আপনার সম্পর্ক। সংসারও সুখের হবে।
৩. মাঝে মাঝে শাশুড়িকে তাঁর পছন্দের কিছু উপহার দেওয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে হাদিয়া বিনিময় করো। এর দ্বারা অন্তরের সংকীর্ণতা ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়।’
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯২৫০)
এই হাদিয়া নিজেই কিনে দিতে হবে তা জরুরি নয়, বরং মাঝে মাঝে স্বামীকে কিনে দিতে বলা। এতে শাশুড়ি মনে মনে অনেক খুশি হবেন এবং পুত্রবধূকে বেশি স্নেহ করবেন।
৩. শ্বশুরালয়ের বদনাম প্রতিবেশীর কাছে করবেন না
এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই প্রতিবেশী আপনার বদনামের কথা তার পেটে রাখবে না, এটা শতভাগ নিশ্চিত। সন্দেহ নেই, যার কারণে আপনার সংসারে আগুন জ্বলে উঠবে। তা ছাড়া এর কারণে গিবতের গুনাহ হয়।
৪. শাশুড়ির কাছ থেকে তার অতীতের সুখ-দুঃখের গল্প শুনবেন
এতে সম্পর্কের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। শাশুড়ির প্রতি এক প্রকার আবেগ তৈরি হবে। শাশুড়ি আপনাকে শাসন কিংবা বকাঝকা করে থাকলে তার কারণ কী; এটাও বোঝা সহজ হবে।
মহান আল্লাহ সহায় হোন।