আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে, বিশেষ করে অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাগদাদকে কেন্দ্র করে যে বৈশ্বিক রেনেসাঁর সূচনা হয়েছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপই হলো ‘বাইতুল হিকমাহ’ বা ‘জ্ঞানের গৃহ’। সমকালীন ইতিহাসচর্চায় বাইতুল হিকমাহকে প্রায়শই শুধু একটি বিশাল গ্রন্থাগার বা অনুবাদকেন্দ্র হিসেবে সরলীকরণ করা হয়। তবে গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত মধ্যযুগের প্রথম রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত একটি বহু সাংস্কৃতিক একাডেমি, যা মানবসভ্যতার প্রাচীন জ্ঞানভাণ্ডারকে স্রেফ সংরক্ষণই করেনি, বরং তার এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়েছিল।
আব্বাসীয় খিলাফতের ভূ-রাজনীতি ও মেধার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
উমাইয়া বংশের পতনের পর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয়রা যখন খিলাফতের দায়িত্ব নেয়, তখন সাম্রাজ্যের কেন্দ্র দামেস্ক থেকে স্থানান্তরিত হয় বাগদাদে। দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর কর্তৃক ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে টাইগ্রিস নদীর তীরে বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা শুধু একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল একটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন। উমাইয়াদের আরবকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আব্বাসীয়রা পারসিক, সিরিয়াক এবং ইহুদি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করে।
খলিফা আল-মনসুর নিজের ব্যক্তিগত পাঠাগার ‘খিজানাতুল হিকমাহ’ (জ্ঞানের ভাণ্ডার) দিয়ে যে যাত্রার সূচনা করেছিলেন, খলিফা হারুন আল-রশিদের আমলে তা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। তবে এই উদ্যোগ একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে খলিফা আবদুল্লাহ আল-মামুনের (রাজত্বকাল : ৮১৩-৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ) সময়ে। খলিফা আল-মামুন ছিলেন যুক্তিবাদী ‘মুতাজিলা’ দর্শনের অনুসারী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঐশ্বরিক বাণীর সত্যতাকে অনুধাবন করার জন্যও মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও যুক্তির বিকাশ অপরিহার্য। এই দর্শন বাইতুল হিকমাহকে একটি রাজকীয় তোশাখানা থেকে মুক্তচিন্তার এক স্বাধীন চত্বরে পরিণত করে।
অনুবাদ আন্দোলন : একটি বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর
বাইতুল হিকমাহর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈপ্লবিক অধ্যায় হলো এর ‘অনুবাদ আন্দোলন’। খলিফা আল-মামুন ঘোষণা করেছিলেন, যেকোনো দুর্লভ পাণ্ডুলিপির প্রমিত আরবি অনুবাদের বিনিময়ে অনুবাদককে সেই গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা হবে। এই অর্থনৈতিক উদ্দীপনা তৎকালীন পৃথিবীর পণ্ডিত সমাজকে বাগদাদমুখী করতে বাধ্য করেছিল।
তবে এই অনুবাদ আন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তৎকালীন প্রধান অনুবাদক, একজন নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টান পণ্ডিত হুনায়ন ইবনে ইশহাকের নেতৃত্বে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে কাজ চলত। প্রথমে গ্রিক বা সংস্কৃত মূল পাঠকে সিরিয়াক ভাষায় এবং পরে তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আরবিতে রূপান্তর করা হতো। প্লেটোর ‘রিপাবলিক’, অ্যারিস্টটলের ‘মেটাফিজিকস’, ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’, টলেমির ‘অ্যালমাজেস্ট’ থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানী গ্যালেন ও হিপোক্রেটিসের সব কাজ আরবিতে অনূদিত হয়। একই সঙ্গে প্রাচীন ভারতের ব্রহ্মগুপ্তের গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ আরবিতে ‘সিন্ধিন্দ’ নামে অনূদিত হয়ে আরবদের শূন্য এবং দশমিক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। খলিফার দরবারে মেধার মূল্যায়ন হতো, ধর্মের নয়। ফলে খ্রিস্টান, ইহুদি, পারসিক, জরোস্ট্রিয়ান এবং হিন্দু পণ্ডিতরা একই ছাদের নিচে বসে সভ্যতার অভিন্ন জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করছিলেন। এটি ছিল মধ্যযুগের বুকে দাঁড়িয়ে এক চরম আধুনিক বৈশ্বিকীকরণের রূপরেখা।
অনুবাদের গণ্ডি পেরিয়ে মৌলিক বিজ্ঞান ও দর্শন
ইউরোপীয় অনেক ঐতিহাসিক দীর্ঘদিন ধরে দাবি করার চেষ্টা করেছেন যে,আরবরা শুধু গ্রিক জ্ঞানের ‘সংরক্ষক’ বা ‘পাহারাদার’ ছিল। কিন্তু আধুনিক নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চায় এই দাবি সম্পূর্ণ খণ্ডিত ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাইতুল হিকমাহর পণ্ডিতরা শুধু অনুবাদ করেননি, তাঁরা প্রাপ্ত জ্ঞানকে কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করেছিলেন।
গণিতশাস্ত্রে বিপ্লব : মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি ভারতীয় ও গ্রিক গণিতকে বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারার জন্ম দেন, যা আজ ‘আল-জাবর’ বা বীজগণিত নামে পরিচিত। তাঁর প্রণীত পদ্ধতিই আজকের ডিজিটাল পৃথিবীর মূল ভিত্তি ‘অ্যালগরিদম’।
বলবিদ্যা ও প্রকৌশল : বনু মুসা ভ্রাতৃদ্বয় (আহমদ, মুহাম্মদ ও হাসান) তাঁদের কিতাব ‘আল-হিয়াল’ গ্রন্থে শতাধিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নকশা প্রণয়ন করেন, যা আধুনিক সাইবারনেটিক্স এবং রোরটিক্সের আদি উৎস।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মানমন্দির : খলিফা আল-মামুনের প্রত্যক্ষ অর্থায়নে বাগদাদের শাম্মাসিয়া এবং দামেস্কে দুটি সর্বাধুনিক মানমন্দির স্থাপিত হয়। এখানকার বিজ্ঞানীরা টলেমির মহাজাগতিক হিসাবের ত্রুটিগুলো সংশোধন করেন এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পৃথিবীর পরিধি ও অক্ষের হেলে থাকা পরিমাপ করেন।
কাগজের সহজলভ্যতা ও মেধার গণতন্ত্রীকরণ
বাইতুল হিকমাহর এই বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পেছনে একটি প্রযুক্তিগত অনুঘটক কাজ করেছিল—তা হলো কাগজের আবিষ্কার। ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে তলাসের যুদ্ধে বান্দ চীনা কারিগরদের কাছ থেকে আরবরা কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে। বাগদাদে প্রথম কাগজের কল স্থাপনের ফলে পার্চমেন্ট বা পশুর চামড়ার ওপর নির্ভরতা হ্রাস পায়। কাগজের এই সহজলভ্যতা জ্ঞানকে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসে। বাগদাদের ‘সুক আল-ওয়াররাকিন’ বা কাগজ বিক্রেতাদের বাজারে শত শত লাইব্রেরি ও প্রকাশনা সংস্থা গড়ে ওঠে, যা জ্ঞানকে সমাজে সমবণ্টন বা গণতন্ত্রীকরণ করতে সাহায্য করেছিল।
পতন : একটি সভ্যতার অকাল বিস্মৃতি
ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়টি রচিত হয় ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি। মোঙ্গল সেনাপতি হালাকু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী বাগদাদ অবরোধ করে খিলাফতের অবসান ঘটায়। এই ধ্বংসযজ্ঞ শুধু একটি রাজনৈতিক পরাজয় ছিল না, এটি ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়। মোঙ্গলরা বাইতুল হিকমাহর শত বছরের সংগৃহীত লাখ লাখ পাণ্ডুলিপি টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেয়। সমকালীন ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন এবং অন্যদের বিবরণী অনুযায়ী, বইয়ের কালির কারণে টাইগ্রিস নদীর পানি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছিল এবং মানুষের রক্তে বাগদাদের মাটি লাল হয়ে গিয়েছিল। এই পতনের পর মুসলিম বিশ্ব তার জ্ঞানতাত্ত্বিক নেতৃত্ব চিরতরে হারিয়ে ফেলে, যার ধাক্কা আজ পর্যন্ত তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার
মহাখালী, ঢাকা