kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কোরআন শেখাচ্ছেন অন্ধ হাফেজ রুমান

রায়হান রাশেদ   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কোরআন শেখাচ্ছেন অন্ধ হাফেজ রুমান

অন্ধ হাফেজ মুহাম্মদ রুমান। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মাহমুদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মগল কাজি ছিলেন কৃষক। ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। ১৯৮৪ সালে তাঁর জন্ম। তখন চোখে আলো ছিল। দেড় বছর বয়সে তাঁর জ্বর হয়—টাইফয়েড জ্বর। ছয় মাস লাগাতর জ্বর ছিল। এর মধ্যে বাম চোখের আলো চলে যায়। সাত বছর বয়সে ডান চোখেরও আলো হারিয়ে ফেলে রুমান। তখন থেকে পুরোপুরি অন্ধ।

শিক্ষার হাতেখড়ি : বাবা চাইতেন, রুমান কোরআনে হাফেজ হবে। বাড়িতে হুজুরও রেখেছিলেন একজন। কিন্তু পড়া হচ্ছিল না। তখন ১৯৯৯ সাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি হন রুমান। দুই মাস পর ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আসেন রুমান। তিনি আর স্কুলে যাননি। ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন স্যারকে। একদিন স্যার বাড়ি এলেন তাঁকে নিতে। স্বপ্ন দেখালেন। বাড়ির লোকেরা যেতে বলেন। তিনি যাননি। কোরআন শেখার জন্য বেকুল হয়ে থাকেন।

কোরআনের পথে : স্কুল ছেড়ে বাড়িতে সকালের মক্তবে কিছু দিন পড়েছেন রুমান। দেখেন, এভাবে পড়া হচ্ছে না। ভাইদের মাধ্যমে অন্ধদের মাদরাসা খুঁজতে থাকেন। একদিন ভৈরবের শরফুদ্দিনের হাত ধরে ঢাকার মুহাম্মদপুরে আল মারকাজুল ইসলামিয়ায় ভর্তি হন। মাদরাসায় ব্রেইল পদ্ধতিতে কোরআন পড়ার নিয়ম শেখেন। তাঁর ক্লাসে ৩০ জন ছাত্র ছিল। এর মধ্যে ১৩ জনই অন্ধ। শিক্ষকদের কেউ অন্ধ ছিল না। দুই বছরে নাজেরা (কায়দা-কানুনের নিয়ম মেনে কোরআনের রিডিং পড়া) পড়েন। যেদিন নাজেরা শুরু করেন, বাবা সেদিন খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। সেখানে তিন বছরে ২৪ পারা মুখস্থ করেন। শিক্ষকরা তাঁর প্রতি খুশি ছিলেন। এরপর রায়পুরার বালুয়াকান্দি মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে হাফেজ মাওলানা তাজুল ইসলামের কাছে বাকি ছয় পারা মুখস্থ করেন। এখানে তিনি ব্রেইল পদ্ধতিতেই পড়তেন। মুখস্থ করে শুধু হুজুরকে শুনিয়ে আসতেন।

হেফজ শেষ করে আলেম হওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করেন রুমান। চট্টগ্রাম যান। তখন ২০০৮ সাল। আল মারকাজুল ইসলামিয়ায় কিতাব বিভাগে ভর্তি হন। শিক্ষকদের কথা শুনে লিখে তাদের দেখাতেন। এভাবে মিজান জামাত পর্যন্ত পড়তে পেরেছিলেন।

হাজারো ছাত্রের শিক্ষক তিনি : ২০১২ সালে পাবনার বন্ধু ফোন করে চাকরির অফার করে। চাকরির জায়গা বগুড়া। অন্ধ ও ভালো দুই ধরনের ছাত্রকে পড়াতে হবে। রুমান ভাইদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ভাইয়েরা রাজি হন। তাঁকে সাহস দেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের কথা বলেন। দেড় হাজার টাকা বেতনে সেখানে চাকরি করতেন রুমান। ১৪ মাস ছিলেন সে মাদরাসায়। পরে মায়ের পীড়াপীড়িতে চলে আসেন। এরপর চাকরি নেন বালুয়াকান্দি মাদরাসায়। সেখানে তিন বছর পড়ান। প্রায় হাজার ছাত্রকে কোরআন পড়িয়েছেন তিনি। ২৫ জন তাঁর হাতে গড়া ছাত্র হাফেজ হয়েছে। এর মধ্যে আটজন অন্ধ। বালুয়াকান্দি থাকাবস্থায় বিয়ে করেন। এখন তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে।

মাদরাসা করেছেন রুমান : ২০১৬ সালে রায়পুরার মাহমুদাবাদে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন রুমান। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নীলকুঠির পাশেই মাদরাসা। বাবার রেখে যাওয়া ১৫ শতাংশ জমিতে মাদরাসা করেন। নাম রাখেন মাহমুদাবাদ মগল কাজি ইসলামিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা। ভাইয়েরা মিলে টিনের লম্বা দুটি ঘর, বাথরুম ও গোসলখানা করে দেন। প্রতি মাসে ভাইয়েরা মিলে মাদরাসায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা দান করেন। স্থানীয় লোকেরাও দান করেন। জনগণের সহযোগিতায় মাদরাসা টিকে আছে।

রুমানই মাদরাসার মোহতামিম ও প্রধান হাফেজ। শিক্ষক আছেন মোট চারজন। ছাত্র আছে ৬০ জনের মতো। এর  মধ্যে ছয়জন অন্ধ। এরই মধ্যে  একজন ছাত্র হাফেজ হয়েছে। এখানে পড়তে ছাত্রদের কোনো বেতন দিতে হয় না; বরং তাদের খাবার, নাশতা, জামা-কাপড় বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।

নির্ধারিত ফান্ড ছাড়া মাদরাসা পরিচালনা করতে কষ্ট হচ্ছে রুমানের। রুমান  বলেন, ‘মাদরাসা পরিচালনা খুব কষ্টের ব্যাপার। আবার আমি অন্ধ। কুলিয়ে উঠতে পারছি না। প্রায় লাখ টাকা জোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে। আমার ভাইয়েরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। আশপাশের লোকেরাও চেষ্টা করছে। কিন্তু ভালোমতো চলতে পারছি না। মাদরাসার জন্য একটি নির্দিষ্ট ফান্ড হলে ভালো হতো।’

 

 



সাতদিনের সেরা