kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

মডারেট মুসলিম মানে কী

আতাউর রহমান খসরু   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মডারেট মুসলিম মানে কী

ইংরেজি Moderate  শব্দের বাংলা অর্থ মধ্যপন্থী। সে হিসেবে ‘মডারেট মুসলিম’-এর অর্থ ‘মধ্যপন্থী মুসলিম’ করলে হয়তো অতি সরলীকরণ করা হবে। কেননা পরিভাষাটির উদ্ভাবক পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ অর্থেই তা ব্যবহার করে। তবে এর সঙ্গে মিশে আছে মূল্যবোধ ও চেতনার নিগূঢ় সম্পর্ক। মুসলিম বিশ্বের যারা নিজেদের ‘মডারেট মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দেয় তারাও সযত্নে নিজেদের আলাদা করে রাখে সাধারণ শ্রেণির মুসলমান থেকে।

মডারেট মুসলিম পরিভাষার জন্ম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম দেশগুলো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় পুঁজিবাদী গণতন্ত্র। আবার কোথাও পশ্চিমাদের প্রশ্রয়ে দীর্ঘায়িত হয় স্বৈরাচারী সামরিক শাসন। এই দুই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই আশির দশকের শেষভাগে মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভ ও জাগরণের সৃষ্টি হয়। পরিবর্তনকামী মুসলিমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন এবং বৈপ্লবিক কমিউনিস্টদের মতো সশস্ত্র বিপ্লবের পথ—দুটিই অনুসরণ করে। তবে উভয় পদ্ধতি পশ্চিমা স্বার্থ ও অর্থনৈতিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় হয়। তাই এই মুসলিমদের বিপরীতে ইউরোপবান্ধব একটি মুসলিম গোষ্ঠী সৃষ্টি করার জোর তাগিদ অনুভব করে ইউরোপ। মুসলিম হলেও যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাবিকে অযৌক্তিক মনে করবে এই শ্রেণির নামই ‘মডারেট মুসলিম’।

ইভান ইয়াজবেক হাদ্দাদ ও টেইলর গলসন তাঁদের ‘Overhauling Islam: Representation, Construction, and Cooption of ‘Moderate Islam’ in Western Europe’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে পশ্চিমের সম্ভাব্য হুমকি ও মডারেট মুসলিম তৈরি সংক্রান্ত পশ্চিমা প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দুজন লেখকই বলার প্রয়াস পেয়েছেন যে ১৯৪৫ সাল তথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ‘ইসলামী হুমকি’ সৃষ্টি হয়। নব্বইয়ের দশকে তালেবান ও আল-কায়েদার মতো সংগঠনের বিস্তার হওয়ায় পশ্চিমারা বিষয়টিতে মনোযোগ দিতে শুরু করে এবং ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর তারা সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই সময় মুসলিম জাতির দিক থেকে পশ্চিমের প্রতি সৃষ্ট ‘হুমকি’ মোকাবেলা করতেই মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী মুসলিমদের সংজ্ঞা নির্ণয় করার প্রয়োজন অনুভূত হয়। পাশাপাশি মডারেট বা মধ্যপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে পশ্চিমা বিশ্ব। সুতরাং মডারেট মুসলিমের ধারণা বহু আগে থেকে সৃষ্টি হলেও ১১ সেপ্টেম্বরের পর তা তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। লেখকদের মতে, ইউরোপবান্ধব মডারেট মুসলিম ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ব্যাপারে ইউরোপ একমত। তারা মনে করে, মুসলিম সমস্যার সমাধানের পথ হলো ধর্মীয় পরিবর্তন ও ‘গ্রহণযোগ্য ইসলাম’-এর কাঠামো দাঁড় করানো।  

 

পশ্চিমাদের চোখে মডারেট মুসলিম কারা?

পশ্চিমারা ‘মডারেট মুসলিম’ বলতে পশ্চিমা-ভাবাপন্ন বা পশ্চিমের জন্য হুমকি নয় এমন মুসলিমদেরই বোঝায়। আর রাজনৈতিক সচেতন মুসলিমদেরই তারা নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে। ‘দ্য হেগে’ অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কাউন্টার টেররিজম’ (আইসিসিটি) প্রকাশিত গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত  ‘Moderate Muslims and Islamist Terrorism: Between Denial and Resistance’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক মডারেট মুসলিমের বিবেচ্য বিষয়গুলো এভাবে উল্লেখ করেন—‘যাদের মডারেট মুসলিম বলা হয় তাদের আমরা কেন মডারেট বলব? এ জন্য যে তারা শান্তিপ্রিয়? তারা সন্ত্রাসবিরোধী? তারা পশ্চিমাদের দলে বা পশ্চিমাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন?’ এরপর লেখক মডারেট মুসলিমের দুটি সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছেন। আকিল বিলগ্রিম বলেন, ‘মডারেট মুসলিম হলো, যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় অঙ্গীকারবদ্ধ আর মৌলবাদীরা ইসলামী শরিয়ার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।’ এ. রাবাসা বলেন, ‘মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী মুসলিমের মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তি হলো আইনি ব্যবস্থার ওপর। যেমনটি পশ্চিমারা মনে করে শরিয়া আইনের প্রয়োগ করা উচিত নয়।’ (পৃষ্ঠা ৮-৯)

 

নিজেদের পরিচয় যেভাবে দেয় মডারেট মুসলিমরা

মডারেট মুসলিমরা নিজেদের আধুনিকতা, সাম্য, মানবিকতা ও উদারপন্থার ধারক বলে দাবি করে। তারা মনে করে, অন্য মুসলিমদের তুলনায় তারা আধুনিক ও উদার। তবে মুসলিম সমাজের সাধারণ ধারণা হলো, যারা দ্বিনচর্চায় উদাসীন, তারাই মডারেট; তারা দ্বিনের আপসকামী। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রেন্ড’-এ প্রকাশিত  ‘Building Moderate Muslim Networks’ বইয়ে মডারেট মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক (ধর্ম অনুমোদিত নয় এমন) আইনি উৎস গ্রহণ, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রতি সম্মান, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যেদের বিরোধিতা—উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতিটিই ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যেমন—নারী অধিকার বলতে উত্তরাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা, যা ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের পরিপন্থী। (পৃষ্ঠা ৬৬-৬৮)

 

ইসলামে আধুনিকতা মধ্যপন্থা

‘মডারেট মুসলিম’ পরিভাষার ওপর দুটি দৃষ্টিনন্দন শব্দের প্রলেপ লাগানো হয়। তা হলো, আধুনিকতা ও মধ্যপন্থা। মূলত মুসলিম সমাজে পশ্চিমা ভাবাপন্ন একটি শ্রেণি তৈরির প্রধান দাবিই এই দুটি শব্দ। অথচ আধুনিকতা ও মধ্যপন্থা ইসলামের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।

মধ্যপন্থা : মধ্যপন্থা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এভাবে আমি তোমাদের একটি মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি। যাতে তোমরা মানবজাতির প্রতি সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৪৮)

ড. ইউসুফ আল-কারজাভি সমকালীন ‘ওয়াসতিয়া’ বা মধ্যপন্থী চিন্তাধারায় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি মধ্যপন্থার ব্যাখ্যায় ছয়টি বিষয়ের সমন্বয়ের কথা বলেছেন, এক. পূর্বসূরিদের অনুসৃত নীতি ও সংস্কার। দুই. বিশ্বাসের সংকীর্ণতা ও ব্যাপকতা। তিন. বিশ্বাসের অপরিবর্তনীয় ও পরিবর্তনীয় ক্ষেত্র। চার. মুসলিম আইনের ঐতিহ্য ও স্বগত বৈশিষ্ট্য। চার. নয়া প্রেক্ষিত বিবেচনা। পাঁচ. ক্রমধারার অপরিহার্যতা। ছয়. বিশ্বসভ্যতায় অংশগ্রহণ। তাঁর মতে, এই সমন্বয় ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে হবে ইসলামের মূলনীতি ও মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ন রেখে।

(shorturl.at/hiyG7) আধুনিকতা : সত্তাগতভাবেই ইসলাম আধুনিক। তাই আধুনিকতার সঙ্গে ইসলামের বিরোধ নেই। বিশ্ববরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা তাকি উসমানি বলেন, ‘ইসলাম প্রকৃতির অনুকূল একটি ধর্ম। এটি আধুনিকতাবিরোধী নয়; বরং তা আধুনিক বিশ্বের প্রবর্তক। বহু ক্ষেত্রে ইসলাম আধুনিকতাকে উৎসাহিত করেছে। ... তবে তা নতুনত্বের অর্থে আধুনিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা সব নতুন বিষয় মানুষের জন্য উপকারী নয়। ইসলাম আধুনিকতাকে কল্যাণ ও অকল্যাণের অর্থে মূল্যায়ন করে।’ (‘ইসলাম অ্যান্ড মডার্নিজম’, পৃষ্ঠা ৪-৬)

আসলে মুসলমানদের পুনর্জাগরণ ও সমাজসংস্কারের বিকল্প নেই। কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করে। নতুন সংকটের সমাধান উদ্ভাবন (ইজতিহাদ) ও অচলাবস্থার সংস্কার (তাজদিদ) বিধি অনুসরণ করেই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হবে।

মন্তব্য