kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

নওমুসলিমের কথা
নুহ হামিম কিলার

ক্যাথলিক পরিবার থেকে ইসলামের পথে

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্যাথলিক পরিবার থেকে ইসলামের পথে

বিখ্যাত পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী নুহ হামিম কিলার ১৯৫৪ সালে আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রাদেশিক এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। রোমান ক্যাথলিক হিসেবে এক রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে তিনি বেড়ে ওঠেন। একপর্যায়ে ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের আকিদা ও বিশ্বাস সম্পর্কে নানা রকম প্রশ্ন তাঁর মনে দোলা দিতে থাকে। অবশেষে ১৯৭৭ সালে মিসরের কায়রোতে গিয়ে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন ড. ইকবাল কবীর মোহন

নুহ হামিম কিলার খ্রিস্ট ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “১৯৬৩ সালের দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিল অনুযায়ী চার্চের নির্ধারিত কোনো মাপকাঠি ছিল না।

এ কারণেই ক্যাথলিক চার্চীয় উপাসনা ও প্রথাগুলো বরাবর পরিবর্তন চলে আসছিল। গির্জার পাদ্রিরা চার্চের নিয়ম-কানুনে নমনীয়তার পক্ষপাতী ছিল। তা সত্ত্বেও তারা সাধারণ ক্যাথলিক সমাজকে অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়াচ্ছিল। আল্লাহ প্রেরিত পবিত্র গ্রন্থ ইনজিল ইবরানি থেকে লাতিন, লাতিন থেকে ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে তার অনেক কিছু আজ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনের আরো একটি কারণ ছিল তাদের আকিদা ও বিশ্বাসের জটিলতা। যেমন—‘ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস’। কোনো সাধারণ খ্রিস্টান তো নয়ই, বরং কোনো পাদ্রিও যুক্তিগ্রাহ্যভাবে এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস মতে, ‘আল্লাহ জান্নাতে অবস্থান করে জগতের রাজত্ব পরিচালনা করছেন। পৃথিবীতে আছেন আল্লাহর পুত্র ঈসা মসিহ, যিনি ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মানবতাকে রক্ষা করেছেন। আর ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.), যিনি একটি শুভ্র পাখিরূপে বিচরণ করছেন।’”

তিনি আরো বলেন, “ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটিতে আমি যখন খ্রিস্টবাদ নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা শুরু করি তখন আমার বুঝে এলো যে নিউ টেস্টামেন্ট ও ওল্ড টেস্টামেন্ট মূল গ্রন্থের সত্যাসত্যকেই সন্দেহের মাঝে ফেলে দিয়েছে। আমি জ্যাকসজারমিয়াসের লেখা ‘দ্য প্রবলেম অব হিস্টরিক্যাল জিসাস’ পড়েছি। জারমিয়াস এ শতাব্দীতে নিউ টেস্টামেন্টের একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী। তিনি পবিত্র ইনজিলের মূল ভাষায় বিশিষ্ট পণ্ডিত রুডলিফ রোলেটরের এ মতবাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন যে নিউ টেস্টামেন্টের ওপর ভিত্তি করে হজরত ঈসা (আ.)-এর কোনো গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য জীবনী লেখা সম্ভব নয়। খ্রিস্টবাদে বিশ্বাসী প্রসিদ্ধ পণ্ডিত যখন এ চরম সত্যকে স্বীকার করে নিয়েছেন তখন বিরোধী পক্ষের জবাব দেওয়ার জন্য খ্রিস্টানদের কাছে অন্য কোনো দলিল-প্রমাণ অবশিষ্ট থাকে কি? বাইবেলে আল্লাহ পাকের ঐশী বাণীকে কল্পকাহিনির সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, পরিশেষে কাহিনিগুলোই ঐশী বাণীর ওপর প্রাধান্য লাভ করেছে। কোনো মানুষের পক্ষে বাইবেলের কল্পকাহিনি থেকে ঐশী বাণীকে পৃথক করা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে আমি আর্থার শওপান হার ও  ফ্রেডরিকের নাতাশা পড়েছি। কিন্তু কোনোটিই খ্রিস্টবাদের ওপর আমার আস্থাহীনতা দূর করতে পারেনি। আমি ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর একটি গ্রন্থও পড়েছি। এই গ্রন্থ পাঠ করে জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। আইজেআর বেরিজ কর্তৃক অনূদিত কোরআন শরিফও আমি পড়েছি, যদিও অনুবাদটি ছিল একজন খ্রিস্টানের। তথাপি তার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে বাইবেলের পরিবর্তে কোরআন আল্লাহর কালাম হওয়ার প্রমাণ মেলে এবং কোরআনের মাহাত্ম্য ও প্রাধান্য প্রমাণিত হয়। এতে আল্লাহকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে এবং মানুষকে নিছক বান্দা হিসেবে উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্কে সুন্দর ও সাবলীলভাবে বিধৃত হয়েছে।”

নুহ হামিম কিলারের ভাষায়, ‘একসময় আরবি ভাষা শেখার জন্য আমি শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। এক বছর পর আমি আরবি ভাষায় পুরোপুরি দক্ষতা অর্জনের জন্য কায়রো গমন করি। মিসরে আমার এমন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, যার দ্বারা ইসলাম সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আরো সুদৃঢ় হয়। পবিত্র কোরআনের প্রতি সেখানকার মুসলমানদের যে অগাধ বিশ্বাস দেখেছি, খ্রিস্টানজগতের কোথাও আমি তা দেখিনি। একদা প্রাতর্ভ্রমণে বের হয়ে নীল নদের তীরে একচিলতে কাপড়ে জনৈক ব্যক্তিকে নামাজ পড়তে দেখলাম। নামাজে সে খুব মনোযোগী ছিল। স্বীয় প্রভুর সঙ্গে তার মনোনিবেশ এতই গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল সে আর এ জগতে নেই।’

মন্তব্য