kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

বাংলাদেশের দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি মসজিদ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

১৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বাংলাদেশের দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি মসজিদ

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম

রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পল্টনের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী বায়তুল মোকাররম। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ। ১৯৫৯ সালে বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি গঠনের মাধ্যমে ঢাকায় একটি উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন তৎকালীন বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানি ও তাঁর ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানি।

পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে মসজিদটির জন্য ৮.৩০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়।

স্থানটি নগরীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকেও ছিল নিকটবর্তী। সেই সময় মসজিদের অবস্থানে একটি বড় পুকুর ছিল, যা পল্টন পুকুর নামে পরিচিত ছিল। পুকুরটি ভরাট করে ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান মসজিদের কাজের উদ্বোধন করেন।

পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশা করেন সিন্ধুর বিশিষ্ট স্থপতি আব্দুল হুসেন থারিয়ানি। নকশায় স্থান পায় দোকান, অফিস, গ্রন্থাগার, কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থাসহ নানা সুবিধা।

মসজিদটির প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি, শুক্রবার। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও মনোমুগ্ধকর এই মসজিদে একসঙ্গে ৩০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে এটি বিশ্বের দশম বৃহত্তম মসজিদ।

১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। বর্তমানে বায়তুল মোকাররম মসজিদটি আটতলা। নিচতলায় রয়েছে বিপণিবিতান ও অত্যাধুনিক সুসজ্জিত একটি বৃহৎ মার্কেট কমপ্লেক্স। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় নামাজ পড়া হয়। মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে অজুর ব্যবস্থাসহ মহিলাদের জন্য পৃথক নামাজকক্ষ ও পাঠাগার।

২০০৮ সালে সৌদি সরকারের অর্থায়নে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। এই মসজিদের শোভাবর্ধন ও উন্নয়নের কাজ এখনো অব্যাহত।

 

ধনবাড়ী শাহি মসজিদ

ইসলামী ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের ধারক ও বাহক টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নওয়াব শাহি জামে মসজিদ। এটি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পৌরসভায় অবস্থিত।

মসজিদটির প্রথম খণ্ড নির্মাণ করেন তুর্কি বংশোদ্ভূত ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ নামের দুই সহোদর। পরবর্তী সময়ে মসজিদটির সম্প্রসারণকাজ করেন বাংলা ভাষার প্রথম প্রস্তাবক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যুক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, ধনবাড়ীর বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। আজ থেকে ১১৫ বছর আগে মসজিদটির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আধুনিক রূপ দেন তিনি।

প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর বানানো এই মসজিদ সংস্কারের আগে ছিল আয়তাকার। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৩.৭২ মিটার (৪৫ ফুট) এবং প্রস্থ ছিল ৪.৫৭ মিটার (১৫ ফুট)।

বর্তমানে এটি একটি বর্গাকৃতির মসজিদ এবং সাধারণ তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকার মোগল মসজিদের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। সংস্কারের পর মসজিদের প্রাচীনত্ব কিছুটা লোপ পেলেও এর চাকচিক্য ও সৌন্দর্য অনেক  বেড়েছে।

দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের ভেতরের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে কড়িপাথরের লতা-পাতা আঁকা অসংখ্য রঙিন নকশা ও কড়িপাথরের মোজাইক, যা প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে। বাইরের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে সিমেন্ট আর কড়িপাথরের টেরাকোটা নকশা।

মসজিদে প্রবেশ করার জন্য বানানো হয়েছে পাঁচটি প্রবেশপথ। পূর্ব দিকে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি আর উত্তর ও দক্ষিণে আরো একটি করে দুটি—সর্বমোট পাঁচটি।

৩৪টি ছোট ও বড় গম্বুজ মসজিদটিকে করেছে আরো নান্দনিক। আরো আছে ১০টি বড় মিনার। প্রতিটির উচ্চতা ছাদ থেকে প্রায় ৩০ ফুট। মসজিদের দোতলার মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। মিনারের ওপর লাগানো তামার চাঁদগুলো মসজিদের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

মসজিদের ভেতরটা অলংকৃত করেছে মোগল আমলের তিনটি ঝাড়বাতি। শোভা পাচ্ছে সংরক্ষিত ১৮টি হাঁড়িবাতি, যা নারকেল ব্যবহার করে জ্বালানো হতো। সুপ্রাচীন মসজিদটিতে একসঙ্গে ২০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে।

মসজিদের পাশেই রয়েছে শান-বাঁধানো ঘাট ও কবরস্থান। এখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর দুই বছর আগে তিনি এই মসজিদে চালু করেন ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াতের ব্যবস্থা (নামাজের সময় বাদে), যা গত প্রায় এক শ বছরে এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন তিলাওয়াত সচল রাখতে নিয়োজিত আছেন পাঁচজন হাফেজ, যা প্রতিদিন মসজিদে আসা মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের অভিভূত করে।

এককথায় প্রাচীন আমলের মানুষের ইবাদত-বন্দেগি ও ইসলামী ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে ধনবাড়ী শাহি মসজিদ।

 

ষাটগম্বুজ মসজিদ

খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় এর নির্মাণকারী সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখলে এটি যে খান-ই-জাহান নির্মাণ করেছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। ধারণা করা হয়, তিনি ১৫০০ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি বহু বছর ধরে বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট, ভেতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট, ভেতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮.৫ ফুট পুরু।

সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহর (১৪৩৫-৫৯) আমলে খান আল-আজম উলুগ খান-ই-জাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন। খান-ই-জাহান বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন, যা পরে ষাটগম্বুজ মসজিদ হয়। তুঘলকি ও জৌনপুরি নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট।

মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১টি বিশাল আকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে সাতটি করে দরজা। মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার আছে। এগুলোর নকশা গোলাকার এবং ওপরের দিকে সরু হয়ে গেছে। এদের কার্নিসের কাছে বলয়াকার ব্যান্ড এবং চূড়ায় গোলাকার গম্বুজ আছে। মিনারগুলোর উচ্চতা ছাদের কার্নিসের চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনারে পেঁচানো সিঁড়ি আছে এবং এখান থেকে আজান দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এর একটির নাম রওশন কোঠা, অন্যটির নাম আন্ধার কোঠা। মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে ছয় সারিতে অবস্থিত এবং প্রতি সারিতে ১০টি স্তম্ভ আছে। প্রতিটি স্তম্ভই পাথর কেটে বানানো, শুধু পাঁচটি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই ৬০টি স্তম্ভ এবং চারপাশের দেয়ালের ওপর তৈরি করা হয়েছে গম্বুজ। মসজিদটির নাম ষাটগম্বুজ মসজিদ হলেও এখানে গম্বুজ মোটেও ৬০টি নয়, গম্বুজ ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি। পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজা ও পশ্চিম দেয়ালের মাঝের মেহরাবের মধ্যবর্তী সারিতে যে সাতটি গম্বুজ, সেগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মতো। বাকি ৭০টি গম্বুজ অর্ধগোলাকার।

মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মেহরাব আছে। মাঝের মেহরাবটি আকারে বড় এবং কারুকার্যমণ্ডিত। এই মেহরাবের দক্ষিণে পাঁচটি এবং উত্তরে চারটি মেহরাব আছে। শুধু মাঝের মেহরাবের ঠিক পরের জায়গাটিতে উত্তর পাশে যেখানে একটি মেহরাব থাকার কথা, সেখানে আছে একটি ছোট দরজা। কারো কারো মতে, খান-ই-জাহান এই মসজিদটি নামাজের কাজ ছাড়াও দরবারঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন, আর এই দরজাটি ছিল দরবারঘরের প্রবেশপথ। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদটি মাদরাসা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

(বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন)

 

বজরা শাহি মসজিদ

মোগল স্থাপত্যশৈলীর উজ্জ্বল নিদর্শন বজরা শাহি মসজিদ, যা নোয়াখালী জেলার প্রাণকেন্দ্র মাইজদী থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা নামক স্থানে অবস্থিত।

প্রায় তিন শ বছর আগে, ১৭৪১ সালে মোগল জমিদার আমান উল্লাহ খান দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদের আদলে এই মসজিদ নির্মাণ করেন, যা আজও মোগল স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে।

জানা যায়, জমিদার আমান উল্লাহ তাঁর বাড়ির সামনে ৩০ একর জমির ওপর উঁচু পারযুক্ত একটি বিশাল দিঘি খনন করেছিলেন। সেই দিঘির পশ্চিম পারেই নির্মাণ করা হয়েছিল আকর্ষণীয় তোরণবিশিষ্ট ঐতিহাসিক এই মসজিদ। প্রায় ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য, ৭৪ ফুট প্রস্থ ও ২০ ফুট উচ্চতার তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদ যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

মসজিদকে মজবুত করার জন্য মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে ভিত তৈরি করা হয়েছিল। দৃষ্টিনন্দন মার্বেল পাথরে অলংকৃত করা হয়েছিল গম্বুজগুলো। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতি দরজা। প্রবেশপথের ওপরই রয়েছে কয়েকটি গম্বুজ। পশ্চিমের দেয়ালে আছে কারুকার্যখচিত তিনটি মেহরাব।

মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর বিশেষ অনুরোধে মক্কা শরিফের বাসিন্দা, তৎকালীন অন্যতম বুজুর্গ আলেম হজরত মাওলানা শাহ আবু সিদ্দিকী ঐতিহাসিক এই মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে নিয়োজিত হন। তাঁর বংশধররা যোগ্যতা অনুসারে আজও এই মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে প্রথম ইমাম সাহেবের সপ্তম পুরুষ ইমাম হাসান সিদ্দিকী ওই মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষ এই মসজিদে নামাজ আদায় করে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক মসজিদটির ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

আজগর আলী চৌধুরী জামে মসজিদ

চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ থেকে সোজা পশ্চিমে তিন কিলোমিটার গেলেই হালিশহরের বড়পোল এলাকা। সেখান থেকে আরো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তরে এগোলেই হালিশহরের চৌধুরীপাড়া। ১৭৯৫ সালে এখানেই নির্মাণ করা হয় মোগল স্থাপত্য নকশায় চুন-সুরকির দৃষ্টিনন্দন আজগর আলী চৌধুরী জামে মসজিদ। মসজিদটি নির্মাণ করেন হালিশহরের সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারের প্রয়াত আজগর আলী চৌধুরী।

১০ শতক জায়গায় তৈরি মসজিদটির সামনে আছে বিশাল এক পুকুর, যা প্রায় ১০০ শতক জায়গাজুড়ে। মসজিদের দক্ষিণে ২০ শতক জায়গায় আছে কবরস্থান। উত্তরে ২৬ শতক জায়গার ওপর আছে চৌধুরী পরিবারের প্রতিষ্ঠিত উত্তর হালিশহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

প্রায় আড়াই শ বছর আগে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল তাজমহলের আদলে। মসজিদের ছাদে শোভা পেয়েছে বড় তিনটি গম্বুজ ও ২৪টি মিনার। পোড়ামাটির রঙের এই মসজিদের চারপাশ সাজানো হয়েছে নানা রকম নকশা দিয়ে। শুধু বাইরের দেয়ালই নয়, ভেতরের দেয়াল ও কাঠামোজুড়ে মোগল স্মৃতিচিহ্ন প্রদর্শন করে যাচ্ছে চোখ-ধাঁধানো নানা রকম নকশা। মজার ব্যাপার হলো, এই মসজিদে প্রচলিত কোনো জানালা নেই। মসজিদটি দেখতে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক প্রতিদিন এখানে ভিড় জমায়।

তিন বছর আগে মোগল আমলে তৈরি মসজিদটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়লে ঐতিহ্যের দুর্লভ এই মসজিদ সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে পেছনে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করার কাজ শুরু হয়। মোগল স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনতে খরচ করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

এলাকাবাসীর আগ্রহে পুরাতাত্ত্বিক এই নির্দশন না ভেঙে পেছনে ৭০ শতক জায়গার ওপর সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন মসজিদটি নির্মাণ করছেন চৌধুরী পরিবারের ওয়ারিশরা। নতুন মসজিদের নকশাও নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের। নতুন মসজিদটি বানানো হয়েছে অনেকটা সংসদ ভবনের আদলে। মসজিদটির তিন পাশেই রাখা হয়েছে জলাধার। ওপর থেকে মনে হবে পানির ওপরই ভেসে আছে যেন আল্লাহর এই প্রিয় ঘর।

 

তারা মসজিদ

সাদা মার্বেলের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত ঐতিহাসিক তারা মসজিদ। পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত এটি, যা তৎকালে মহল্লা আলে আবু সাঈয়ীদ নামে পরিচিত ছিল। মসজিদটি নির্মিত হয় আঠারো শতকের প্রথম দিকে; যদিও মসজিদের গায়ে কোনো ধরনের নির্মাণ তারিখ খোদাই করা নেই।

মসজিদটির পূর্ব নাম মির্জা সাহেবের মসজিদ। জানা যায়, আঠারো শতকে ঢাকার মহল্লা আলে আবু সাঈয়ীদ (পরে যার নাম আরমানিটোলা হয়) আসেন ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি মীর আবু সাঈয়ীদের নাতি জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান)। তিনিই এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। সেকালে মির্জা সাহেবের মসজিদ হিসেবে এটি বেশ পরিচিতি পায়। ১৮৬০ সালে মারা যান মসজিদের মূল নির্মাণকারী মির্জা গোলাম পীর।

পরে ১৯২৬ সালে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির সংস্কার করেন। সে সময় মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধনে এর কারুকার্যে ব্যবহার করা হয় জাপানের রঙিন চিনি-টিকরি পদার্থ। মনোমুগ্ধকর কারুকার্যখচিত মসজিদটিতে মোগল স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব পাওয়া যায়।

জমিদার মির্জা গোলামের আমলে মসজিদটি ছিল তিন গম্বুজবিশিষ্ট। মসজিদের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৩ ফুট (১০.০৬ মিটার) আর প্রস্থ ছিল ১২ ফুট (৪.০৪ মিটার)।

পরবর্তী সময়ে ১৯২৬ সালে আলী জানের সংস্কারের সময় মসজিদের পূর্ব দিকে একটি বারান্দা বাড়ানো হয়। ১৯৮৭ সালে তিন গম্বুজ থেকে পাঁচ গম্বুজ করা হয়। পুরনো একটি মেহরাব ভেঙে দুটি গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়। বর্তমানে মসজিদের দৈর্ঘ্য ৭০ ফুট (২১.৩৪ মিটার) এবং প্রস্থ ২৬ ফুট (৭.৯৮ মিটার)।

মসজিদটির বর্তমান ইমাম মাওলানা ইউসুফ বিন আব্দুল মাজিদ। তিনি ঢাকার বিখ্যাত আলেম ও লেখক।