মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়লেও দেশের বাজারে তা না বাড়ায় বিপুল অর্থ লোকসানের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগে চড়া দামে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কিনে দেশে তা কম দামে বিক্রি করায় গত চার মাসেই প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছাড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটিক প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়মিত সমন্বয় করে আসছিল সরকার। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসের শুরুতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন দাম নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে সাধারণ মানুষের ওপর চাপের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে প্রতি লিটার তেলে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাকে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, সংকটের ভয়াবহতা ও বিপুল পরিমাণ লোকসানের চিত্র তুলে ধরে গত ২৩ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত মার্চ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত সময়ে জ্বালানি তেলের মোট ৭২টি পার্সেল আমদানি করা হয়েছে। শুধু এই সাড়ে চার মাসের ব্যবধানেই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। সংকট সামাল দিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার জরুরি আবেদন জানিয়েছে বিপিসি।
চিঠিতে বিপিসির মারাত্মক তারল্য সংকটের চিত্র তুলে ধরে আরো বলা হয়, স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে বিপিসিকে সব সময় অন্তত দুই মাসের জ্বালানি তেল আমদানির সমপরিমাণ অর্থ অর্থাৎ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন বা সংস্থান হিসেবে হাতে রাখতে হয়। কিন্তু বর্তমানে টানা লোকসানের কারণে দেখা দিয়েছে বিপিসির নগদ অর্থের তীব্র সংকট। চিঠিতে আরো বলা হয়, এই মুহূর্তে আর্থিক সহায়তা না পেলে ব্যাংকগুলোতে সময়মতো এলসি (ঋণপত্র) বা আমদানির মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। আর তা না করা গেলে বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা দেশকে চরম জ্বালানি সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, দেশের বাজারে সেটির পুরো প্রভাব না ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই ঘাটতি পূরণ না হলে দেশের পুরো জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।


