আমদানি করা এলএনজিনির্ভর চট্টগ্রামে গ্যাসের জোগান চাহিদার অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র গ্যাসসংকট। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে।
চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ৫৬.২৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা অঞ্চলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চট্টগ্রামের গ্যাস আরো ডাইভার্ট করা হলে সংকট ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বর্তমানে গ্যাসসংকটের কারণে চট্টগ্রামে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএলে সার উৎপাদন উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে শুধু বহুজাতিক সার কারখানা কাফকো চালু রয়েছে। কাফকোতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এ ছাড়া গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রামের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বর্তমানে শুধু শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন চালু আছে, যেখানে দৈনিক দেওয়া হচ্ছে ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিদ্যুৎ ও সার কারখানা বাদে বাকি ১৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক ও আবাসিক খাতে।
এসব খাতে গ্যাসের জোগান সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। অথচ চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
গ্যাসের চাপ (প্রেসার) আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে কাঙ্ক্ষিত প্রেসার না থাকায় দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। অনেক এলাকায় রান্নাঘরের চুলা না জ্বলায় দুর্ভোগে পড়েছে গৃহিণীরা।
নগরীর বাদুড়তলা এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী সায়মা তাবাস্সুম বলেন, ‘সকালে স্বাভাবিক ছিল গ্যাসের চাপ। দুপুর হতে হতে একেবারেই নেই। চুলা আর জ্বলছে না। গ্যাস থাকবে না জানলে রাতেই রান্না করে রাখতাম। এখন বাইরে থেকে খাবার কিনেই আমাদের খেতে হচ্ছে।’
দেশের অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ সরোয়ার আলম বলেন, তাঁদের এইচএম স্টিল ও গোল্ডেন ইস্পাত কারখানায় আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ কম পাওয়া যাচ্ছে। এতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে এখনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইস্পাতশিল্পে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কমে গেলে চুল্লিকে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় নিতে বেশি সময় লাগে। ফলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন সম্ভব হয় না। অথচ গ্যাসের ব্যবহার ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয় না।
কেজিডিসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম পুরোপুরি এলএনজিনির্ভর। কোনো কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প কোনো উৎস থাকে না। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনালটি মেরামতে কাজ চলছে এবং আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে এটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে টার্মিনাল চালুতে বিলম্ব হলে কিংবা ঢাকার চাহিদা মেটাতে চট্টগ্রাম থেকে অতিরিক্ত গ্যাস সরিয়ে নেওয়া হলে বন্দরনগরীর গ্যাসসংকট তীব্র হয়ে উঠবে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ) মো. রফিক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিদিনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ কম হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপও কমে গেছে। এ কারণে কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে গ্যাস ব্যবহারে সমস্যা হচ্ছে। তবে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। আশা করছি, দু-তিন দিনের মধ্যে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হবে।’




