ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনগণের অভূতপূর্ব প্রত্যাশার মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই পরিবর্তনকে দেশের মানুষ নতুন করে রাজনৈতিক গতিপথ সাজানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বৃহত্তর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকরা গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তনের উদাহরণ দিলেও সমালোচকদের মতে অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ওই সময়ের শাসনব্যবস্থা ক্রমাগত অনির্বাচিত সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, যাঁদের অনেকে বিদেশি নাগরিক। পাশাপাশি সক্রিয় ছিল প্রভাবশালী ‘কিচেন ক্যাবিনেট’। সেই সঙ্গে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়াই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। সংস্কারে না গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ আটকাদেশ দিয়ে প্রতিশোধের রাজনীতি বাস্তবায়ন করেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় তারা কতজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করেছে কিংবা শেষ পর্যন্ত বিচার করা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ জনসমক্ষে উত্থাপন না করায় প্রশ্ন উঠছে।
বড় সমালোচনা তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কথিত রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে। সমালোচকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আমলাতন্ত্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। সুশাসন শক্তিশালী করার পরিবর্তে উল্টো ওই সময়ে আত্ম-অহংকার, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
টিআইবির সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে এই উদ্বেগগুলো আরো জোরদার হয়েছে। ওই অনুসন্ধানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনের দুর্নীতির সূচক আরো খারাপ হওয়ার চিত্র উঠে আসে।
সমালোচকরা বলছেন, স্বচ্ছ শাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত জবাবদিহি ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের মতো ওই সরকারের উপদেষ্টারা সংসদীয় তদারকি বা জনসমীক্ষার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকাও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি যদিও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত এবং পশ্চিমা সরকার, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছেন।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ইউনূসের প্রশাসন সরকারি পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এবং তাঁর সহযোগী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও করসংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর ব্যাবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোকে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়ার মতো বাড়তি সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরও বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকে এই চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে।
কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এই চুক্তি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান হতাশার কারণটি হলো আইন-শৃঙ্খলার অবনতি। ‘মব’ ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। অন্যদিকে ‘তাওহিদি জনতা’ নামের একাধিক গোষ্ঠী ক্রমাগত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সমালোচকরা অভিযোগ করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে দেশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর জনগণের আস্থা হ্রাস পায়।
আবার অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়াও সমানভাবে উদ্বেগজনক ছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ায় ভিন্নমত প্রকাশে অনিচ্ছা তৈরি হয়।
সমালোচকরা যুক্তি দিয়ে বলছেন, বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে প্রশাসন ক্রমেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং ন্যায্য সমালোচনাকে স্তব্ধ করতে ‘ফ্যাসিস্টে’র তকমা দিতে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকরা, জামায়াত ও এনসিপির পাশাপাশি, সমসাময়িক রাজনীতিতে একই ধরনের বাগাড়ম্বর ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ শুরুর ঘোষণা এই উদ্বেগকে আরো তীব্র করেছে। এই বিক্ষোভকে সমালোচকরা শুধু গণতান্ত্রিক বিরোধিতা হিসেবে নয়, বরং স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির আরেকটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
এসব ঘটনাপ্রবাহের আলোকে এটি যুক্তিযুক্ত যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত ত্রুটিগুলোর জন্য জামায়াত ও এনসিপির রাজনৈতিক দায়ভার বহন করা উচিত। উভয় দলই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে লাভবান হয়েছে। এর ফল হিসেবে তারা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগকারী উপদেষ্টারাও তদন্তের আওতার বাইরে থাকতে পারেন না। ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি আটক, পক্ষপাতমূলক বিচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বার্থের সংঘাতে যেকোনো অভিযোগ যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে। জবাবদিহি গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তি, এটি নির্বাচিত ও অনির্বাচিত উভয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার হবে তার প্রতিশ্রুতির নিরিখে নয়, বরং তার রেখে যাওয়া কীর্তির আলোকে। বাংলাদেশকে যদি সামনে এগিয়ে যেতে হয়, তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা আন্তর্জাতিক সমর্থন নির্বিশেষে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রশাসনকে জবাবদিহির একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। টেকসই গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের সমান প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধার ওপর নির্ভর করে।