ফুটবলে সময়ের সঙ্গে লড়াই করাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। একজন খেলোয়াড় যত প্রতিভাবানই হন না কেন, বয়স একসময় তাঁর গতি কমিয়ে দেয়, শারীরিক সামর্থ্য সীমিত করে ফেলে। তাই বিশ্ব ফুটবলে ৩৫ বছরের পরও সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে খেলে যাওয়া বিরল ঘটনা। আর ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে গোল করে নতুন ইতিহাস গড়া তো আরো বিরল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করার কীর্তি গড়েছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানিতে প্রথম তাঁর গোলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং এখন ২০২৬—প্রতিটি বিশ্বকাপেই তিনি গোল করেছেন। দুই দশক ধরে বিশ্ব আসরে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ অর্জন। সেই কারণেই রোনালদোর এই অর্জনকে শুধু একটি রেকর্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে; আসলে অধ্যবসায় ও পেশাদারির এক অসাধারণ উদাহরণ। আমার কাছে এই রেকর্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধারাবাহিকতা। ফুটবলে এক মৌসুম ভালো খেলা সম্ভব, কয়েক বছরও শীর্ষ পর্যায়ে থাকা সম্ভব। কিন্তু ২০ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে নিজেকে ধরে রাখা খুব কম মানুষই পারে। আমরা প্রায়ই তাঁর গোল নিয়ে আলোচনা করি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে হাজারের কাছাকাছি গোলের রেকর্ড, অসংখ্য শিরোপা, পাঁচটি ব্যালন ডি’অর—এসবই তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু আমি মনে করি, তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বড় শক্তি হলো নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতা। রোনালদোর ক্যারিয়ারকে যদি কয়েকটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে প্রতিটি পর্যায়ে তিনি নিজেকে বদলে নিয়েছেন। তরুণ বয়সে তিনি ছিলেন দুরন্ত গতির উইঙ্গার, যিনি ড্রিবলিং দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন বিধ্বংসী গোলস্কোরার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের খেলার ধরন পরিবর্তন করে আরো কার্যকর ফরোয়ার্ডে পরিণত হয়েছেন। এই অভিযোজন ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
একজন সাবেক ফুটবলার ও কোচ হিসেবে আমি জানি, এর পেছনে কতটা কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। প্রতিদিনের অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম, রিকভারি—সবকিছুতেই সর্বোচ্চ পেশাদারি দেখাতে হয়। তাঁর সময়েও অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার ছিলেন, কিন্তু সবাই লম্বা সময় টিকে থাকতে পারেননি। কারণ প্রতিভা দরজা খুলে দেয়, কিন্তু শৃঙ্খলাই আপনাকে সেখানে ধরে রাখে। রোনালদো সেই শৃঙ্খলার প্রতীক। আজকের তরুণ ফুটবলারদের জন্যও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আধুনিক ফুটবলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, জনপ্রিয়তা এবং অর্থের ঝলকানির মধ্যে অনেক সময় মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে; কিন্তু রোনালদো দেখিয়েছেন, সাফল্যের প্রকৃত ভিত্তি হলো কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি কখনো অর্জনে থেমে থাকেননি। নতুন লক্ষ্য স্থির করেছেন, নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।
বয়স যখন অনেকের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন রোনালদো। আর সে কারণেই ৪১ বছর বয়সেও তিনি শিরোনাম তৈরি করছেন। হয়তো একদিন তাঁর রেকর্ড ভাঙবে। হয়তো ভবিষ্যতে আরেকজন ফুটবলার ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়বেন। কিন্তু রোনালদোর এই দীর্ঘ যাত্রা, নিজের শরীর ও মানসিকতাকে এত দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখার ক্ষমতা এবং প্রতিটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার সামর্থ্য তাঁকে ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য জায়গায় নিয়ে বসিয়েছে।



১৮ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসে সব আলো কেড়ে নিয়েছেন মেসি। এবারের আসরে দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে বিস্ময়ের গল্পই লিখছেন তিনি। ৩৯ বছর বয়সে এসে অনেকেরই যেখানে ক্যারিয়ারের সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে, সেখানে মেসি যেন নতুন করে আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্বকাপের আকাশে। বয়স বাড়লেও আর্জেন্টাইন অধিনায়কের পায়ে মলিন হয়নি জাদুর ঔজ্জ্বল্য। হয়তো গতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু খেলার সুর বাঁধা, রক্ষণভাগের ফাঁক খুঁজে নেওয়া আর গোলের সামনে নির্মম নির্ভুলতায় তিনি এখনো অতুলনীয়। মাঠে তাঁর প্রতিটি স্পর্শে জেগে ওঠে গ্যালারি, প্রতিটি পাসে তৈরি হয় সম্ভাবনার নতুন গল্প। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে তিনি শুধু গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষেই নেই, আবারও হয়ে উঠেছেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। যেন সময়কে হার মানিয়ে খেলে চলা এক শিল্পী, যাঁর তুলিতে এখনো আঁকা হয় ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো।
