ব্রাজিল-হাইতি (সকাল ৬-৩০ মিনিট)
প্যারাগুয়ে-তুরস্ক (সকাল ৯টা)
নেদারল্যান্ডস-সুইডেন (রাত ১১টা)
জার্মানি-আইভরি কোস্ট (রাত ২টা)
ইকুয়েডর-কুরাসাও (কাল সকাল ৬টা)

ব্রাজিল-হাইতি (সকাল ৬-৩০ মিনিট)
প্যারাগুয়ে-তুরস্ক (সকাল ৯টা)
নেদারল্যান্ডস-সুইডেন (রাত ১১টা)
জার্মানি-আইভরি কোস্ট (রাত ২টা)
ইকুয়েডর-কুরাসাও (কাল সকাল ৬টা)

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলে আমরাই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেব।
ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, শিক্ষামন্ত্রী

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করে দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার যেকোনো চেষ্টা দেশের মানুষ মেনে নেবে না। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের রায় অস্বীকার করে কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না।
গতকাল শুক্রবার সকালে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারায়ণগঞ্জ মহানগর কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সরকারের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখনো সময় আছে জনগণের রায় মেনে নেওয়ার। অন্যথায় জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে শাসনব্যবস্থা চালাতে গেলে জনগণই হিমালয়ের মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’
তিনি বলেন, ‘’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল বলেই ২০২৬ সালে দেশে একটি নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। শহীদ ও আহতদের ত্যাগের কারণেই আজকের সংসদ, সরকার ও বিরোধী দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই তাঁদের অবদানকে খাটো করা বা উপেক্ষা করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। তাই নির্বাচনের ফলাফলে যা-ই হয়েছে, আমরা মেনে নিয়েছি।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের গণভোটও অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, গণভোটে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, বিভিন্ন ব্যাংকে হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য উপাচার্যদের সরিয়ে দলীয় অনুগতদের বসানো এবং জেলা পরিষদে দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একদলীয় শাসনের পরিণতি কখনোই শুভ হয়নি।
সংসদে বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার সংস্কৃতিরও সমালোচনা করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ যেমন বিরোধী দলকে আক্রমণ করত, এখন একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের রাজনীতি তরুণসমাজ গ্রহণ করবে না।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড় বাজেট দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তবে তা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে লুটপাট ও দুর্নীতি হয়েছে, সেই পথ অনুসরণ না করার আহবান জানান তিনি। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
নারায়ণগঞ্জবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে জালিয়াতি, সন্ত্রাস, কালো টাকার প্রভাব ও নানা ধরনের নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংকে উপেক্ষা করে নারায়ণগঞ্জের মানুষ ১১ দলীয় জোটকে একটি আসন উপহার দিয়েছে।’ ভোট গণনা ও ফলাফল সুষ্ঠু হলে আরো একটি আসনেও জোটের বিজয় হতো বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সেই বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের শিল্প ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একসময় নারায়ণগঞ্জ ছিল দেশের শিল্প রাজধানী। কিন্তু বর্তমানে সেই গৌরব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ শুনেছেন বলেও জানান।
কর্মী সম্মেলনে বক্তব্যের এক পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনো ধর্মকে ব্যবহার করে ভোটের রাজনীতি করেনি। বরং যারা ভোটের বিনিময়ে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, জনগণ তাদের ভালোভাবেই চেনে।
বক্তব্যের শেষে তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বারকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
আওয়ামী লীগের কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেনি
একই দিন বিকেলে মুন্সীগঞ্জ শহরের কাচারিতে একটি পার্টি সেন্টারে জেলা জামায়াত আয়োজিত বার্ষিক সদস্য (রুকন) সম্মেলনেও বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি স্বাধীনতার ইতিহাস, গণ-অভ্যুত্থান, গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন, কিন্তু কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি, এটাই বাস্তবতা।’ তিনি আরো বলেন, ইতিহাসে যার যেখানে অবদান রয়েছে, তা স্বীকার করা উচিত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইতিহাসকে জবাই করলেও মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাস কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।’ তিনি আ স ম আব্দুর রবের প্রথম পতাকা উত্তোলন এবং কর্নেল এম এ জি ওসমানীর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, জাতীয় ইতিহাসে সবার অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সাংবিধানিক সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল সংস্কার বাস্তবায়ন। তাঁর দাবি, গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার এখন তা বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছে।
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দ্বিতীয় গণভোট হয়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে। সে সময়ও আপত্তি করেননি। তৃতীয় গণভোট হয়েছে বেগম জিয়ার হাতে, সেটাও মেনে নিয়েছেন। কিন্তু চতুর্থ গণভোট হয়েছে জনগণের হাতে, এটা আপনারা মেনে নেবেন না।’
অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, বাজেটে ৫০ থেকে ৬০টি খাতে কর কমানো হলেও নিত্যপণ্যের দাম কমেনি। তাঁর দাবি, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে এসব সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বাজেটে অনেক কর ছাড় দেওয়া হলো, কিন্তু এতে যদি জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তাহলে এর সুবিধা কে নিচ্ছে?’
সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণমাধ্যমকে সত্যের পক্ষে থাকতে হবে এবং মিথ্যার সঙ্গে আপস করা যাবে না।

কিছুতেই কান্না থামছিল না শারমিন আক্তারের। চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলছিলেন, ‘আমি তো কারো দয়া চাইনি। নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ চেয়েছি কেবল। কিন্তু সেটাও পেলাম না সিস্টেমের গলদের কারণে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শারমিন। তাঁর কান্নার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর এক বঞ্চনা। সেই গল্পে যাওয়ার আগে ঘুরে আসি সাতক্ষীরা থেকে।
মেধাবী এই তরুণীর বাড়ি জেলার শ্যামনগরের ৫ নম্বর কৈখালী ইউনিয়নে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা আব্দুল মজিদ কারিগর কৃষক। মা মর্জিনা বেগম গৃহিণী। শৈশব থেকে অনটনের সঙ্গে লড়ছেন শারমিন। খুব দুরন্ত ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে বই-খাতা রেখে বেরিয়ে পড়তেন। পাড়া মাতিয়ে ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে যেত। পড়াশোনাও চলত সমানতালে। শৈশবে স্বপ্ন দেখতেন—ডাক্তার হবেন। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার অসুখ হলো। সেরে ওঠার পর খেয়াল করলেন, আগের মতো সেভাবে পড়তে পারছেন না। খেলতে গেলেও মাঝে-মধ্যে হোঁচট খাচ্ছেন। মা ভেবেছিলেন অসুখ থেকে ওঠায় শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হলো না। ধীরে ধীরে কমতে থাকল চোখের জ্যোতি। ছোট অক্ষরগুলো পড়তে অসুবিধা হতো বেশি। চোখের একেবারে কাছে নিলে তবেই দেখতেন। স্থানীয় ডাক্তারের কাছে তাঁকে নিয়ে গেলে ডাক্তার বললেন, ‘পুষ্টিকর খাবার খেলে বড় হতে হতে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
হঠাৎ যেন সূর্যগ্রহণ : কিন্তু সময় যত গড়ায় শারমিনের চোখের আলো তত কমে। আব্দুল মজিদ কারিগর সাতক্ষীরা, খুলনার ডাক্তার দেখিয়ে শেষে ঢাকায় নিয়ে এলেন মেয়েকে। ডাক্তাররা বললেন, ‘ওর চোখের শিরাগুলো শুকিয়ে গেছে। এটা ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’
কিন্তু মা-বাবার মন মানল না। তাঁরা জমিজমা বিক্রি করে মেয়েকে নিয়ে গেলেন ভারতে। মাসখানেক ছিলেন। কিন্তু কোনো উন্নতি নেই। ধীরে ধীরে আঁধার হয়ে এলো শারমিনের দুনিয়া। পড়াশোনা বন্ধ। মেয়ের এই করুণ দশা সইতে না পেরে এক পর্যায়ে বাবার হার্ট অ্যাটাক হলো। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হলেন ঘরবন্দি। এর পর থেকে পরিবারের ভার শারমিনের বড় ভাই আলমগীরের কাঁধে। তত দিনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। টিউশনি করে চলতেন।
বোঝা হতে চাইলেন না : বছর দুয়েক স্কুলে যেতে পারলেন না শারমিন। বইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তবে শারমিন চাইতেন বইয়ের দুনিয়ায় ফিরতে, অজানাকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। কারো বোঝা নয়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইলেন। ছুটিতে বড় ভাই বাড়িতে এলে তাঁকে বললেন, ‘ভাইয়া রে, এভাবে ঘরে থাকতে ভালো লাগে না। আমি আবার পড়তে চাই।’
বড় ভাই খোঁজ নিয়ে জানলেন, ঢাকার ব্যাপটিস্ট মিশনে শারমিনের মতো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ আছে। তিনি শারমিনকে নিয়ে এলেন ঢাকায়। ভর্তি করিয়ে দিলেন মিরপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে। এখানেই ব্রেইলের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সেই সুবাদে আবার বইয়ের সঙ্গে মিতালি।
আবার গ্রামে : প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামে ফেরেন শারমিন। ভর্তি হতে গেলেন কৈখালী এসআর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু শুরুতে শিক্ষকরা রাজি হননি। দৃষ্টিহীন এই তরুণী কিভাবে পড়াশোনা করবেন? অনুনয়-বিনয় করে শারমিন বললেন, ‘স্যার, আমি পারব। একটা সুযোগ দিন। ফেল করলে দায় আমার।’ অবশেষে সুযোগ হলো। এফডিএ নামের এক সংগঠন তাঁকে ব্রেইল বই দিল।
২০১৫ সালে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৪৪ পেয়ে এসএসসি পাস করলেন শারমিন। আবার ঢাকায় ফিরে ভর্তি হলেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে। এইচএসসিতে পেলেন জিপিএ ৪.১৭।
আনন্দময় ক্যাম্পাস জীবন : এইচএসসি দিয়ে সহপাঠীরা প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করতে লাগলেন। কিন্তু শারমিনের সে সুযোগ কই? পরে বন্ধুদের শিটগুলো ফটোকপি করে নিতেন। পরিচিতদের মাধ্যমে রেকর্ডকৃত সেই শিট পড়তেন। এভাবে পড়েই ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে সুযোগ মিলল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে। ক্যাম্পাসে তাঁর ঠিকানা ১১০ প্রীতিলতা হল। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা আনন্দে কেটেছে তাঁর।
শারমিন বলেন, ‘চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি চাইনি কারো বোঝা হয়ে থাকতে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। ভাইয়া যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।’
সমমনা কয়েকজনের সঙ্গে মিলে ২০১৯ সালে ক্যাম্পাসে একটি সংগঠনও গড়েন। নাম ‘ডিজেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান রিসার্চ অর্গানাইজেশন’। লক্ষ্য—তাঁর মতো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। ক্যাম্পাস ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে উদ্যোক্তাদের একেকজন একেক দিকে চলে গেছেন। আপাতত স্থগিত সংগঠনটির কার্যক্রম।
নতুন করে আঁধার : একসময় সব দেখতেন শারমিন। শৈশব ছিল রঙিন, কৈশোর বিবর্ণ। তখন থেকে চোখের আলোয় নয়, তিনি পৃথিবীকে বোঝেন অনুভূতি দিয়ে। কণ্ঠস্বর শুনে মানুষ চেনা, ভাতের হাঁড়ির গন্ধে দুপুর বোঝা, সাদাছড়িতে পথ মাপা। আর আছে ভয়। পায়ের শব্দে বুঝতে পারেন কেউ আসছে। কিন্তু কোনো স্থাপনা বা স্থির বস্তু তো শব্দ করে না। ফলে সেগুলোর সঙ্গে ধাক্কাও খেতে হয়েছে ঢের। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে থেকে সবকিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়। এবার জীবিকার লড়াই। হল ছেড়ে তিনি ওঠেন মিরপুরের একটা মেসে। নতুন জায়গা মানেই তাঁর কাছে নতুন অন্ধকার। তবু তিনি হাঁটতে লাগলেন। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির আবেদন করতে থাকেন। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বসলেন চাকরির পরীক্ষায়। খাদ্য পরিদর্শক পদে। আয়োজকরাই শ্রুতিলেখক জোগাড় করে দিয়েছিল।
সেদিন কেন কাঁদছিলেন : এই প্রশ্নের জবাব পেতে ফিরতে হবে ১৬ মে, ডেমরার শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে সেদিন ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার পদের পরীক্ষা। শারমিনও ছিলেন প্রার্থী।
সকাল সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রে প্রবেশ করলেন। পরীক্ষা শুরু সকাল ১০টায়। কয়েক মিনিটের মাথায় বেরিয়ে এলেন শারমিন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শ্রুতিলেখকের বিষয়ে কিছু বলা ছিল না। ফলে শারমিন অন্যান্য পরীক্ষার মতোই একজন শ্রুতিলেখক নিয়ে গেলেন। পরীক্ষার হলে বসে নিজের নাম-ধাম লিখছিলেন। এমন সময় হলে প্রবেশ করলেন এক ভদ্রলোক। নিজেকে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েছেন বলে শারমিনের ভাষ্য। ‘শ্রুতিলেখকের অনুমতি নেই’—এই অজুহাতে তিনি শারমিনকে বের করে দিলেন হল থেকে। চোখের জল ফেলতে ফেলতে হল থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা : শারমিন বললেন, ‘ঘরে বাবা অসুস্থ। মায়ের অবস্থা ভালো নেই। পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য চাকরির আশায় বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করি। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়োগ পরীক্ষার সময় শ্রুতিলেখক নিয়ে আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়। আমার অনুমোদিত শ্রুতিলেখককে বাদ দিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আয়োজকরা তাঁদের দেওয়া শ্রুতিলেখক নিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেন। কিন্তু অসুবিধা হলো—বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা আমার বলে দেওয়া উত্তর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখে শেষ করতে পারেন না। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।’
এই জটিলতা নিরসনে এখন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান শারমিন। চান একটা সরকারি চাকরি। বললেন, ‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যেন এমন একটা নিদের্শনা দেন, যাতে আমার মতো এই সমস্যায় আর কাউকে ভুগতে না হয়, যাতে প্রতিবন্ধীরা কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন।’