kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

সাভারে রঙিন মাছের চাষ

জাহিদ হাসান সাকিল, সাভার   

২০ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাভারে রঙিন মাছের চাষ

অ্যাকোয়ারিয়ামে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন জাতের রঙিন মাছ। সাভারের আশুলিয়ার ধলপুর এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা আতিকুর রহমান আতিকের মাছের খামার থেকে গত ১৫ মে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মো. বাদল খাঁ। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার টেঙ্গার চর গ্রামের বাসিন্দা। ছোটবেলায় বাবার অ্যাকোয়ারিয়ামসহ রঙিন মাছের ব্যবসা দেখে বড় হয়েছেন। প্রায় ২৫ বছর আগে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় দোকান ছিল।

বিজ্ঞাপন

একটা সময় তাঁর বাবা অ্যাকোয়ারিয়ামের গোল্ডফিশের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। সেখান থেকেই বাদলের হাতেখড়ি। ১৫ বছর আগে সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়ায় চলে আসেন তিনি। শুরু করেন রঙিন মাছের চাষ। গড়ে তোলেন হ্যাচারিও। এই মাছই এখন তাঁর জীবন-জীবিকা।

সাভার উপজেলায় এমন ১৫ থেকে ২০টি খামার আছে। তারা এসব মাছ বিক্রি করে রাজধানীর কাঁটাবনের ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখান থেকে খুচরা ক্রেতারা কিনে নিয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামে রেখে শখ মেটান। কাঁটাবন আর সাভারের খামারিদের মাঝে আছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তাঁরাও এখান থেকে নিয়ে কিছু লাভে কাঁটাবনে বিক্রি করেন। সেখান থেকেই দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে রঙিন মাছ।

খামারিরা জানান, সাধারণ গোল্ডফিশ, রুইকিন, কমেট, ওরান্ডা, রানচু, ব্ল্যাক মোর, অ্যাঞ্জেল, টেট্রা জেব্রা, ব্লু গোড়ামি, টাইগার বার্ব, ফাইটার ফিশ, সোর্ড টেইল, ব্ল্যাক মলি, গাপ্পি, হোয়াইট মলি, প্লাটি ফিশ, জেব্রা, টেরি চিংড়ি ফিশ ও কই কার্প মাছের চাহিদা আছে ক্রেতাদের মাঝে। ফলে এসব মাছই চাষ করেন খামারিরা।  

বাদল খাঁ বাবাকে হারিয়েছেন দুই বছর আগে। তবে বাবার দেখানো পথেই হাঁটছেন তিনি। সফলতাও পেয়েছেন। দুটি রঙিন মাছের খামারে প্রায় ১৮ থেকে ২০ প্রজাতির মাছের চাষ করেন। মাসে ৫০ হাজার টাকার মতো লাভ হয়। তা দিয়েই তাঁর সংসার চলে সুন্দরভাবে। তাঁর হাত ধরে এ এলাকায় আরো বেশ কয়েকটি খামার গড়ে তুলেছেন তরুণ উদ্যোক্তারা।

২০ শতক জায়গায় বাদল খাঁর খামার। একটি ঘরে মা মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ ও ডিম থেকে পোনা উৎপাদন করেন। পাশের ঘরে পরিবারসহ তাঁর বসবাস। পাশেই ১০ শতক জায়গার ওপর আরো একটি খামার রয়েছে তাঁর। দুটি জমিই লিজ নেওয়া। খামারে ইট দিয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট লম্বা ও পাঁচ ফুট প্রস্থ অনেকগুলো চৌবাচ্চা তৈরি করে সেখানে মাছের পোনা চাষ করছেন। দেড় থেকে দুই ফুট পানিতে একেকটি চৌবাচ্চায় একেক ধরেনর রঙিন মাছের পোনা।

খামারে গিয়ে দেখা যায়, বাদল খাঁ মাছের পরিচর্যা করছেন। ফাইটার ফিশ নামের একটি পুরুষ মাছ ছোট প্লাস্টিকের বক্সে আলাদাভাবে রাখা। কারণ এটি মারামারি করে। অন্য মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাতে।

বাদল খাঁ বলেন, ‘এসব মাছ একটু স্পর্শকাতর। তাই বেশি মানুষের খামারে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে যাঁরা শিখতে চান, তাঁদের অবশ্যই পরামর্শ দেব। ’

পাশের এলাকা ধলপুরে বাদলের পরামর্শে আতিকুর রহমান নামের আরো এক তরুণ গড়ে তুলেছেন রঙিন মাছের খামার। চার লাখ টাকা দিয়ে শুরু করেন তিনি। আতিক বলেন, এসব মাছের নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। রোগবালাই সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। যাঁদের অভিজ্ঞতা আছে অবশ্যই তাঁঁদের সহযোগিতা নিতে হবে। প্রথমে ছোট আকারে শুরু করা ভালো। এরপর ধীরে ধীরে পরিধি বাড়াতে হবে।

আতিকের হাত ধরে তাঁর নিকটাত্মীয় মো. শাহিন তিন বছর আগে রঙিন মাছের খামার করেছেন। মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে কিছু ক্ষতি হলেও এখন অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। মো. শাহিন বলেন, প্রথমে অনেক কিছু বুঝতাম না। এখন অভিজ্ঞতা হয়েছে।

এই তিনজনের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে গড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয় একেকটি খামারে। সাভার এলাকায় আগের চেয়ে খামারির সংখ্যা বেড়েছে বলে লাভের পরিমাণ কিছু কমে গেছে। কারণ নতুন বাজার সৃষ্টি হয়নি। ঘুরেফিরে আগের গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে হয়। তবে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ পেলে নতুন সম্ভাবনা জাগবে এই মাছ চাষে।

এই খামারিরা জানান, একটি মাছ থেকে গড়ে দুই থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত ডিম পাওয়া যায়। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এই ডিম থেকে প্রায় ৭৫ শতাংশ পোনা পাওয়া যায়। পোনা থেকে তিন মাস পর একেকটি মাছ বিক্রির উপযোগী হয়। মাছভেদে প্রতিটি ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়।

রঙিন মাছের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা-গরম দুটিই ক্ষতিকর। ঠাণ্ডার সময় সূর্যের আলো যাতে সরাসরি পানিতে পড়ে সে ব্যবস্থা করতে হবে। গরমের সময় বারবার পানি বদল করতে হবে। সূর্যের আলো থেকে বাঁচাতে চৌবাচ্চার ওপর নেটের ব্যবস্থা রাখা হয়। নিয়মিত খাবার দিতে হবে। আর রোগবালাইয়ের ক্ষেত্রে লবণ ও পটাসিয়াম ব্যবহার করতে হয়। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিজ্ঞ খামারি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সাভার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান সরকার বলেন, ‘ভিয়েতনাম, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এই মাছ আমদানি হয়। এগুলো মূলত মিঠা পানির মাছ। এখন আমাদের দেশে চাষাবাদ শুরু হয়েছে। সাভারে হচ্ছে। ’ তিনি বলেন, ‘তবে মাছের হ্যাচারি করলে অবশ্যই লাইসেন্স নিতে হবে। তাহলে তাদের সরকারি প্রকল্পে তালিকাভুক্ত করা হবে, যাতে তারা সরকারি সহায়তা পায়। সাভারে এখনো বাহারি মাছের ওপর কোনো প্রশিক্ষণ বা বরাদ্দ নেই। তবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা সার্বিক সহযোগিতা করব। ’

রাজধানীর আদাবরে ইমপোর্টেড অ্যাকোয়ারিয়াম ফিশ বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক আহমেদ বলেন, সাভার, কুমিল্লা, মাদারীপুর, ফেনী, বগুড়া, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, নাটোর, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এখন রঙিন মাছ চাষ হচ্ছে। দিন দিন এই চাষ বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ আমদানি করি। মাসে গড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ আনি। সাধারণত থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কা থেকে এসব মাছ আনা হয়। আগের চেয়ে আমদানি কিছুটা বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, এসব মাছের চাহিদা কিন্তু রয়েছে। ফলে আমাদের দেশে গড়ে ওঠা খামারের মাছের বাজার রয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি সম্ভব। ’

 

 



সাতদিনের সেরা