kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

বৈষম্য বিলোপ সনদ

নারী অধিকারের বাধা ৩৭ বছরেও কাটেনি

ফাতিমা তুজ জোহরা

৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারী অধিকারের বাধা ৩৭ বছরেও কাটেনি

নারীর অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক দলিল হিসেবে পরিচিত ‘বৈষম্য বিলোপ সনদ’ (সিডও)। এই সনদে রয়েছে মোট ৩০টি অনুচ্ছেদ। অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে ৩ থেকে ১৬ পর্যন্ত নারীর অধিকারসংক্রান্ত এবং বাকিগুলো কর্মপন্থা ও দায়িত্বসংক্রান্ত।

বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘের সিডও সনদে সই করে। সেই সময় সনদের অনুচ্ছেদ ২, ১৩ (ক) এবং ১৬ (১) (গ) (চ)  সংরক্ষণ (আপত্তিসহ সই) রেখেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে ১৩ (ক), ১৬ (১) (চ) অনুচ্ছেদ থেকে আপত্তি তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু সইয়ের ৩৭ বছরেও বাকি দুই অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬ (গ)  সংরক্ষণ বা আপত্তি তুলে নেওয়া হয়নি। মাঠ পর্যায়ের নারী, মানবাধিকার ও এনজিও সংগঠনগুলো মাঝেমধ্যে সোচ্চার হলেও এ ব্যাপারে দেখা যায়নি সরকারের লক্ষণীয় কোনো পদক্ষেপ।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নীতিনির্ধারকদের কারণেই দাবি আদায় বারবার ছন্দ হারাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, এই দুই ধারা বাস্তবায়নে ধর্মীয় নেতাদের মতানৈক্য, সামাজিক অবস্থা ও পারিবারিক আইন প্রস্তুত নয়।

ধারা-২-এ বলা আছে,  স্বাক্ষরকারী দেশগুলো নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের নিন্দা করে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে। পুরুষের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে নারীর অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করবে এবং আইনের সংস্কার করবে। অর্থাৎ প্রচলিত যেসব আইন, বিধি ও প্রথা নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে তা বাতিল বা পরিবর্তন ও প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা দরকার।

এদিকে ধারা-১৬ (গ)তে বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদে নারী-পুরুষের সম-অধিকার ও দায়িত্ব লাভের কথা বলা হয়েছে।

মহিলা ও শিশু  বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উল্লিখিত দুটি ধারার বিষয়ে সম্প্রতি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বরাবরের মতো ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অনাপত্তি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই দুটি বিষয় মুসলিম পারিবারিক আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগতিপূর্ণ। এর চেয়েও বড় কথা, এই বিষয়গুলো ইসলাম ধর্মের মৌলিক কাঠামোতে আঘাত করে। তাই বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এগুলোর অনুমোদন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বিষয়টি সংবেদনশীল। এটা নিয়ে আপাতত মন্তব্য করতে চাই না।’

সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সিডওর দুই ধারায় আপত্তি তোলার বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, ‘সরকারের সদিচ্ছা থাকলে আপত্তি তোলা সম্ভব। সরকার এটা করতে পারেনি কথাটা ঠিক নয়, সরকার এটা করছে না। এটা সিডওর মূল ধারার পুরোপুরি পরিপন্থী। পারিবারিক আইনে বলা হয়েছে, ধর্মের প্রেক্ষিতে চলা। এখনো আমাদের পারিবারিক আইনে কোনো সংস্কার কিংবা পরিবর্তন হয়নি। আমরাও চাইলে কিছু পরিবর্তন আনতে পারি। তাহলে সাংঘর্ষিক হয় না। অনেক ইসলামী দেশ এই পরিবর্তন করেছে।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আপত্তি দুটি ধারার মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অধিকারগুলো বেশি সংরক্ষণ করা হয়েছে। কোনো মন্ত্রণালয়ের যদি আপত্তি থাকে, তাহলে সেই মন্ত্রণালয়ের নীতি-কর্মপন্থাও সংবিধান অনুসারে হওয়া উচিত।

সিডও কমিটির বিধান অনুযায়ী চার বছর পর পর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রকে সিডও বাস্তবায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। জাতিসংঘ সিডও কমিটি এই প্রতিবেদন জমা নেয়। প্রতিবারই প্রতিবেদন দেওয়ার সময় ‘আপত্তি’ প্রত্যাহার বিবেচনাধীন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ২০১৫ সালে সরকার জানায়, ‘সমাজ প্রস্তুত নয়’। সরকারের এমন মন্তব্য কিভাবে দেখেন—এই প্রশ্নের উত্তরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক একটি সনদ বা দলিলে সই করার মানে জাতীয় আইনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবগুলো ধারা গ্রহণ করতে আমরা বাধ্য। মুসলিম দেশ হিসেবে তিউনিশিয়া এটা বাস্তবায়ন করেছে। সাহস করে চাইলে আমরাও করতে পারি।’ পারিবারিক আইন সংস্কার প্রয়োজন কি না জানতে চাইলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, “নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদে সই করার অর্থ এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেওয়া। সই করে দুটি জায়গা ‘সংরক্ষিত’ রাখা মানে পূর্ণ সমর্থন না দেওয়া। তুরস্ক-ইন্দোনেশিয়ায় পারিবারিক আইনে সংস্কার আনা হয়েছে। এমনকি ভারতে নারীর অধিকারকে প্রাধান্য রেখে যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা থাকে তাহলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”

 

মন্তব্য