kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

বিশেষ লেখা

আরো উজ্জ্বল সেই আলো

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আরো উজ্জ্বল সেই আলো

পৃথিবীর ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ আছে। যেমন—গেটিসবার্গে দেওয়া লিংকনের বক্তৃতা। কিন্তু আমি জানি না পৃথিবীর আর কোনো ভাষণে একটি জাতিকে একই সঙ্গে অহিংস প্রতিরোধ এবং সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের ডাক দেওয়া হয়েছে। এবং একই সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে একটি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। ৪০ মিনিটের ছোট্ট ভাষণ। কিন্তু তা একটি মহাকাব্যের গুরুত্বকে অতিক্রম করেছে। সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য অপ্রস্তুত একটি জাতিকে মাত্র একটি ভাষণ দ্বারা এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করার আর কোনো নজির নেই। সাড়ে সাত কোটি মানুষ একটিমাত্র ডাকে সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং জয়ী হয়েছিল। এই যুদ্ধের সেনাপতি রণাঙ্গনে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর দেশ থেকে দেড় হাজার মাইল দূরে পাকিস্তানের লৌহ কারাগারে। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে তাঁর দেশের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছে এবং সফল হয়েছে। তিনি জাতির পিতা হিসেবে পাকিস্তানি কারাগার থেকে দেশে ফিরে এসেছেন এবং ঐতিহাসিক সংবর্ধনা লাভ করেছেন।

এক ব্রিটিশ সাংবাদিক সিরিল ডান তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন—‘পোয়েট অব পলিটিকস বা রাজনীতির কবি।’ এই প্রথম রঙে-বর্ণে-ভাষায় এবং নৃতাত্ত্বিকভাবে একজন খাঁটি বাঙালি বাঙালিদের নেতা হয়েছিলেন। বাঙালিদের স্বার্থের ব্যাপারে তিনি কোনো আপস করেননি। ফাঁসির আসামি হয়েও ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি বাঙালিদের অধিকার একবিন্দু ছাড়তে রাজি নই।’ এ কথা সত্য শেরেবাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাও বাঙালিদের স্বার্থ-অধিকারের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে ক্রমাগত আপস করে নিজেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তেমনি বাঙালিদেরও ক্ষতি করেছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর বর্তমান বাংলাদেশ (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানিদের দ্বারা চরমভাবে নির্যাতিত ও শোষিত হয়েছে। বাংলাদেশের সব সম্পদ—পাট, তুলা, রেশম বিদেশে রপ্তানি করে সেই বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করেছে। বাংলাদেশ দিনের পর দিন নিঃস্ব হয়েছে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে যে ক্যাপিটাল ট্রান্সফার হয়েছে ইংল্যান্ডে, তার চেয়ে বেশি ক্যাপিটাল ট্রান্সফার হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে, মাত্র ২৪ বছরে। বঙ্গবন্ধু এই শাসন ও শোষণ নীতির বিরুদ্ধেই তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব ঘোষণা করেছিলেন। এই দাবির মধ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা প্যারামিলিশিয়া তৈরি করতে হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য প্রদেশের হাতে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঢাকা বৈঠকে আলোচনায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই প্রস্তাব দুটিতে রাজি হতে পারেননি। এবং বঙ্গবন্ধুও ঘোষণা করেন ছয় দফার পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করবেন না।

পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো যদি এই সময় একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা গ্রহণ করতেন, তাহলে হয়তো একটা আপসরফা হতো। ভুট্টো এই গঠনমূলক ভূমিকার বদলে বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান আর্মিকে উসকে দেন। শুরু হয় ১৯৭১ সালের নির্মম গণহত্যা। তারপরই শুরু হয় বাঙালিদের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার সনদপত্র হলো ৭ই মার্চের ঘোষণা। এই ঘোষণা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ হতো না। তেমনি একটি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশও তৈরি হতো না। প্রায় হাজার বছর আগে ব্রিটিশ রাজাদের কাছ থেকে স্বৈরাচারী ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় ম্যাগনাকার্টার মাধ্যমে। কিন্তু ম্যাগনাকার্টারেও জনগণের হাতে ক্ষমতা যায়নি। গিয়েছিল তখনকার ব্যারনদের হাতে। এই ব্যারনদের পার্টি টোরিদের হাত থেকে জনগণের হাতে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য লেবার পার্টি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে নেতৃত্বের অভাবে এই লেবার পার্টিও টোরিদের পথে চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতন্ত্র এবং গ্রাম্য মহাজনদের কায়েমি স্বার্থ ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা ছিল তাঁর ৭ই মার্চের ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষমতা যাবে তৃণমূল পর্যায়ে। এই লক্ষ্যে তিনি বাকশাল সরকার গঠন করেন, যার ভিত্তি ছিল শোষিতের গণতন্ত্র। ৭ই মার্চের ঘোষণা এবং বাকশাল সৃষ্টির মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা ছিল। এই ধারাবাহিকতার লক্ষ্য ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠন। দেশের ও বিদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বঙ্গবন্ধুকে এই লক্ষ্যে পৌঁছতে দেয়নি। তাঁকে ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে বাংলাদেশে আবার ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের পুরনো ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা। আগে বাংলাদেশের রাজনীতির ভিত্তি ছিল ডেমোক্রেটিক কালচার। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’ কালচার। এই কালচারের প্রবর্তন প্রথম পাকিস্তানে। পাকিস্তানি মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স এটা বাংলাদেশে রপ্তানি করে এবং বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এটা লুফে নেয়। এখন এই কালচারের একাধিপত্যে গোটা বাংলাদেশ জর্জরিত। আওয়ামী লীগ শাসনক্ষমতায় এসেও এই কালচারের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারেনি এখনো।

এ জন্যই ৭ই মার্চের গুরুত্ব এখনো আমাদের জাতীয় জীবনে শেষ হয়ে যায়নি। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যেখানে বিদেশি শোষকদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সেখানে বিদেশি হানাদারের বদলে দেশের শোষকশ্রেণির নামটা বসিয়ে দিন। তাহলে এই ভাষণের আধুনিক তাৎপর্য এবং তার বহমান ঐতিহাসিকতা ধরা পড়বে। ৭ই মার্চ এখনো আমাদের রাজনৈতিক জীবনের ধ্রুবতারা। এই ধ্রুবতারাকে হারালে চলবে না। শুধু ৭ই মার্চ দিবস উদযাপন নয়, এই ভাষণের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করে তা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা দরকার। ৭ই মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। কখনো হারাবে না। ব্রিটিশ রাজনীতিতে ম্যাগনাকার্টা এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। ওই সনদ মেনেই ব্রিটিশ রাজতন্ত্র টিকে আছে। বর্তমান ওয়েস্টমিনস্টার গণতন্ত্রের ভিত্তিও বলতে গেলে এই ম্যাগনাকার্টা। কিন্তু ম্যাগনাকার্টার চেয়ে বিষয়ের গভীরতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। আমাদের জাতীয় জীবনে এই ভাষণ কখনো তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য হারাতে পারে না।

একটি আধাসামন্তবাদী ও ধর্মান্ধ জাতিগোষ্ঠীকে আধুনিক যুগের আলোকে টেনে আনা সহজ নয়। এই দুরূহ কাজটি শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৭ই মার্চ ছিল তাঁর আদর্শের আলোকবর্তিকা। তিনি শতাব্দী-প্রাচীন আমলাতান্ত্রিক শাসন ও সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। এই ভাঙার কাজটা বিপ্লব ছাড়া করা যায় না। তিনি এই বিপ্লব সাধনের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন স্বাধীনতা লাভের পর বাকশাল শাসনতন্ত্র ঘোষণা করে। তিনি ভেবেছিলেন শান্তিপূর্ণ পথে তিনি তাঁর শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লব সফল করতে পারবেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া এই সামাজিক গড্ডলিকা ভেঙে জাতিকে উদ্ধার করা যাবে কি না, তা বলা কঠিন। কিন্তু ৭ই মার্চের ঘোষণা যদি জাতির নবপ্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা যায় এবং তার রাজনৈতিক এবং তা আর্থ-সামাজিক ব্যাখ্যা তরুণ প্রজন্মকে ভালোভাবে বোঝানো যায়, তাহলে বঙ্গবন্ধু এখন জীবিত না থাকলেও এই ভাষণ দেশে আরেক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে।

লন্ডন, শনিবার, ৬ মার্চ ২০২১

মন্তব্য