kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ বাঙালিকে এনে দিয়েছিল দুর্জয় স্বাধীনতা। এ বছর আমরা উদযাপন করব স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। এই সময়ে আমরা ফিরে দেখতে চাই সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো

ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহ

আজিজুল পারভেজ   

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহ

১ মার্চ, ১৯৭১। এ দিনের ঘটনাপ্রবাহ বাঙালিকে পৌঁছে দিল নতুন ঠিকানার সন্ধানে। পলিমাটিতে গড়া বঙ্গীয় বদ্বীপবাসী বাঙালির দ্রোহের রূপ দেখল বিশ্ব।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বাঙালি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করবে, এটা ছিল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ১ মার্চ দুপুর ১টার দিকে আকস্মিক এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের একটি প্রধান দল পিপলস পার্টি এবং অন্য কয়েকটি দল ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান না করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা। দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণির ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। শহরের সব দোকানপাট স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা বিমানবন্দর এবং পিআইয়ের মতিঝিল অফিসের কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস ছেড়ে চলে যান। ফলে বন্ধ হয়ে যায় ঢাকার বিমান চলাচল। ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান একাদশ বনাম আন্তর্জাতিক একাদশের মধ্যে অনুষ্ঠানরত আন-অফিশিয়াল ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ ভণ্ডুল হয়ে যায়। দর্শকরা গ্যালারি ছেড়ে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামেন।

সেদিন স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘সেদিন খেলা দেখতে গেছি। স্কোরগুলো ভালোভাবে বোঝার জন্য আমার সঙ্গে রেডিও রাখতাম। খেলা চলছে। রেডিওতে হঠাৎ ঘোষণা করা হলো, ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সংক্ষিপ্ত ভাষণ। তিনি সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুরু হয়ে গেল। গ্যালারিতে যে কাগজ, শামিয়ানা, বাদামের ঠোঙা ছিল সেগুলো নিয়ে আগুন দেওয়া শুরু হলো। এমনকি নিজের শার্ট খুলে অনেকেই তাতে আগুল লাগাল। কেউ কেউ মাঠে প্রবেশের চেষ্টা করল। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। খেলোয়াড় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা ভয় পেয়ে ড্রেসিংরুমে গিয়ে আশ্রয় নিলেন।’

‘প্রেসিডেন্টের ঘোষণা মানি না মানব না’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি স্লোগানে-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। মিছিলগুলো আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে নির্দেশনার জন্য মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

পূর্বাণী হোটেলে তখন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের জরুরি সভা চলছিল। ওই হোলেটকে ঘিরে তখন স্টেডিয়াম থেকে মতিঝিল পর্যন্ত হাজার হাজার লোকের জমায়েত ঘটে। ঢাকার গেরিলা যোদ্ধা শহীদ রুমীর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যে ৫০-৬০ হাজার মানুষ বাঁশের লাঠি আর লোহার রড ঘাড়ে নিয়ে পূর্বাণীর সামনে সব রাস্তা জ্যাম করে ফেলল। সেকি স্লোগান। পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ আর জিন্নাহর ছবিও পুড়িয়েছে।’

সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে হোটেল পূর্বাণীতে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বাংলার জনগণ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’ তিনি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সর্বাত্মক আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ২ মার্চ ঢাকা শহরে ও ৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশজুড়ে হরতাল পালন এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভা অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন। ৭ই মার্চের জনসভায় আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন বলেও জানান। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে এসে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পল্টনে সমাবেশ করেন ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু নেতারা।

ঢাকা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানেও বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। সন্ধ্যায় মোজাফফর ন্যাপ মিছিল ও পথসভা করে প্রতিবাদ জানায়।

রাতে মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ফার্মগেটে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে ১৪ বছরের কিশোর আমানুল্লাহ, ২৮ বছরের তাজুল হকসহ তিনজন প্রাণ হারান।

রাতে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসভবনে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বৈঠকে মিলিত হন। সন্ধ্যার পর তিনি সন্তোষে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি পাঠান।

গভীর রাতে ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক প্রশাসক এক নতুন আদেশ জারি করে সংবাদপত্রে দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো খবর বা ছবি প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন। পিপলস পার্টি ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রতিবাদে ২ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানে যে সাধারণ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধ্যায় তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

সেদিনের ঘটনা সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের দিনগুলি’-তে। রোজনামচায় তিনি লিখেছেন : ‘বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেড়টা। দরজা খুলে দিয়েই বারেক (গৃহকর্মী) জানাল : ‘সাব রে ফুন করেন আম্মা। খাবারদাবার কিন্যা রাখতে কইছে। কই জানি গণ্ডগোল লাগছে।’ গণ্ডগোল? তা লাগতেই পারে। গত দুই মাস থেকেই তো ঢাকা তপ্ত কড়াই হয়ে রয়েছে। অফিসে ফোন করতেই শরীফ জানাল : ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বেলা ১টার সময় রেডিওতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে শহরের সব জায়গায় হৈচৈ পড়ে গেছে। লোকেরা দলে দলে অফিস-আদালত ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়ে গেছে।...তক্ষুনি আবার বেরোলাম।

এলিফ্যান্ট রোডে উঠতেই দেখি—দুই পাশের ছোট ছোট দোকানগুলোতে লোকজনের অস্বাভাবিক ভিড়। সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে কেনাকাটা করছে।...জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের কী পরিণাম হতে পারে, তা নিয়ে বহু রাত পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা চলল খাবার টেবিলে বসে। রাত প্রায় ১২টার দিকে শুতে গিয়েও ঘুম এলো না। অনেক দূর থেকে স্লোগানের শব্দ আসছে।...কেবল ‘জয় বাংলা’ ছাড়া অন্য স্নোগানের কথা ঠিক বোঝা যায় না। তবু এ সম্মিলিত শত কণ্ঠের গর্জন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে এসে পড়েছে শ্রুতির কিনারে। শিরশির করে উঠছে সারা শরীর। গভীর রাতে আধো-ঘুমে, আধো-জাগরণে মনে হলো যেন গুলির শব্দও শুনলাম।’

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১ মার্চ শুরু হয়েছিল যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, তা অচিরেই অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। পরিণতিতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি প্রথমবারের মতো অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

মন্তব্য