মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে দখলদার আরাকান আর্মির (এএ) ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি জান্তা বাহিনী। আর তার পাল্টা জবাব দিচ্ছে আরাকান আর্মি সদস্যরাও। হামলা ও পাল্টা হামলায় হতাহত বাড়ছে। এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বেসামরিক লোকজন। এ অবস্থায় রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ওপারে বিকট শব্দের বিস্ফোরণে এখানকার সীমান্তবর্তী মানুষজনের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে। সেই সঙ্গে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কাও করছে কেউ কেউ। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার টেকনাফে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদ ও স্থল সীমানায় বিজিবি-কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার ও নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
টানা ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য থেকে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে রাখাইন রাজ্যের মংডু, বুচিডং, রাচিডং টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা দখলে নেয় আরাকান আর্মি। বাকি আছে রাজ্যের রাজধানী সিথুয়ে। এখন সিথুয়ে থেকে উড়ে এসে বিমানে হামলা চালাচ্ছে সরকারি বাহিনী। মংডু থেকে সিথুয়ের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। দখলকৃত রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পড়েছে। জানা গেছে, মায়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে দেশটির সরকারি জান্তা বাহিনীর উপর্যুপরি বিমান হামলায় কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা। দীর্ঘ প্রায় সাত মাস পর বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা চালাল দেশটির সেনাবাহিনী। গত তিন দিনের উপর্যুপরি হামলায় রাখাইনের সাহেববাজার, ভুচিডং ও বলিবাজার এলাকায় বহু লোকজন হতাহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জান্তা বাহিনীর হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে বলিবাজারের আরাকান আর্মির বড় ক্যাম্প। গত বুধবার থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিন আরাকান আর্মির ক্যাম্পগুলো লক্ষ্য করে জান্তা সরকারের বিমান হামলা চলেছে। তবে গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিমান হামলার ঘটনা কমেছে বলে জানা গেছে।
টেকনাফে গতকাল জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভায় অপহরণ, মাদক-অস্ত্র চোরাচালান ও সমুদ্রপথে মানবপাচার বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা উচ্ছেদ, আশ্রয়শিবিরে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করা অনলাইন জুয়া বন্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টেকনাফ উপজেলা পরিষদ সম্মেলনকক্ষে সকাল ১১টা থেকে এই বিশেষ সভা বেলা আড়াইটা পর্যন্ত চলে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী।
সভায় মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং নাফ নদ সংলগ্ন টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তের কয়েক হাজার মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরেন কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। সভায় জানানো হয়, মায়ানমারের অভ্যন্তরে বিমান হামলা ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, নাফ নদ অতিক্রম করে কোনো রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে, সে জন্য সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও টহল বাড়াতে হবে। সভা শেষে এমপি শাহজাহান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে সম্প্রতি বেড়ে যাওয়া বহুমাত্রিক অপরাধের ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনিক চৌধুরী এবং বিজিবি উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানান, সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সেই সঙ্গে অনুপ্রবেশসহ মাদক ও পণ্য পাচার রোধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরীর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজারের রামু বিজিবি সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ, জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, টেকনাফ ২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া, র্যাব-১৫ কক্সবাজার অধিনায়ক লে. কর্নেল নিয়ানুল হালিম খান, উখিয়া ৬৪ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার প্রমুখ।
এদিকে মায়ানমার বাহিনী এবং রাখাইনের বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাতের মধ্যেও টেকনাফের স্থলবন্দর যথারীতি চালু রয়েছে। স্থলবন্দরের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জসিম উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত থাকলেও মাছ বোঝাই তিনটি কার্গো নৌকা গত বৃৃহস্পতিবার সকালে বন্দরের জেটিতে এসে ভিড়েছে। অন্যদিকে গতকালও রপ্তানির পণ্য নিয়ে দুটি কার্গো বোট গেছে মায়ানমারে।


