kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

করোনাকালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক

আরিফুর রহমান   

১৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনাকালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক

প্রতিবছরই বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বহুজাতিক সংস্থাগুলো যে পূর্বাভাস দেয় তার সঙ্গে সরকারের প্রাক্কলনের বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়। এ নিয়ে বিতর্কও কম হয় না। এবারও দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে নানা মত দেখা যাচ্ছে। করোনাকালে প্রবৃদ্ধি নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে বিতর্ক।

বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক বলছে, করোনার প্রভাবে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ শতাংশের নিচে। আরেক বহুজাতিক সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, চলতি বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। আরেক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অবশ্য বলছে, প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬.৮ শতাংশ।

উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর এসব প্রক্ষেপণের সঙ্গে একমত নয় সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।

গত ৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস প্রকাশের পরদিন সেটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান উত্তরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। বিশ্বব্যাংকের এ যাবৎকালের সব প্রক্ষেপণের যদি একটি তালিকা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, তারা যে প্রক্ষেপণগুলো করে, তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। এবারও বিশ্বব্যাংক সেই গতানুগতিক ধারার একটি পূর্বাভাস দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক এবং সরকারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা ঠিক যে মার্চ-এপ্রিলের দিকে দেশের অর্থনীতি যে অবস্থানে ছিল, সেখান থেকে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনই এটা বলা ঠিক হবে না যে অর্থনীতি করোনার আগের পর্যায়ে ফিরে গেছে। তাই সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, সেটা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যায় না। কারণ হিসেবে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, একমাত্র প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির কোনো সূচক এখন ইতিবাচক ধারায় নেই। করোনার প্রভাবে চলতি অর্থবছরের গত দুই মাসের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, কাঁচামাল আমদানি, রাজস্ব আদায় এসব সূচক নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। এসব সূচকের দিকে তাকালে এই ইঙ্গিত বহন করে যে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।

আইএমএফের পূর্বাভাস : এখন থেকে ছয় মাস আগে বহুজাতিক সংস্থা আইএমএফ জানিয়েছিল, করোনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে। ছয় মাস পর এসে এখন আইএমএফ বলছে, চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৮ শতাংশ। আর আসছে ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধি বেড়ে হবে ৪.৪ শতাংশ। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের যৌথ বার্ষিক সভায় প্রকাশ করা আইএমএফ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। আইএমএফ বলছে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করা শীর্ষ তিনটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে দুটি দেশ যথাক্রমে গায়ানা ও দক্ষিণ সুদান। উল্লেখ্য, অন্য সংস্থাগুলো প্রবৃদ্ধির হিসাব করে থাকে অর্থবছর ধরে আর আইএমএফ প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করে থাকে ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকাবর্ষ ধরে। আইএমএফের মতে, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে প্রথম কয়েকটি মাস স্থবির থাকলেও জুলাই থেকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে। আইএমএফ জানিয়েছে, চলতি বছর ২২টি দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হতে পারে। অর্থাৎ এসব দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়বে। ওই ২২টি দেশের মধ্যে একটি বাংলাদেশ। এই ২২টি দেশ বাদে বাকি সব দেশের জিডিপি সংকুচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হবে বলেও জানিয়েছে আইএমএফ।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস : করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১.৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রবৃদ্ধি কেন ২ শতাংশের নিচে নেমে আসবে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বহুজাতিক সংস্থাটি বলছে, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রপ্তানিতে। প্রবাসী আয়েও ধাক্কা লেগেছে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশের মতো। স্থবির হয়ে গেছে কর্মসংস্থান। এসব কারণে চলতি অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি ১.৬ শতাংশ অর্জিত হবে। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রধান মার্সি টেম্বন গণমাধ্যমকে বলেন, করোনার কারণে বৈশ্বিক যে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়বে। তবে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার প্রণোদনা প্যাকেজসহ যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা ছিল সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত।

এডিবির পূর্বাভাস : এখন থেকে এক মাস আগে আরেক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি জানিয়েছে, চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬.৮ শতাংশ। ম্যানিলাভিত্তিক সংস্থাটির মতে, শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স সাফল্যে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। একই সঙ্গে করোনা মহামারি সংকট কেটে যাচ্ছে। ফলে আশা করা যায়, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৬.৮ শতাংশ।

বাংলাদেশে এডিবির আবাসিক প্রধান মনমোহন প্রকাশ গণমাধ্যমকে বলেন, মহামারি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপুল চাপের পরও যথাযথ প্রণোদনা ঘোষণা এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়িয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা নিয়ে সরকার অর্থনীতিকে ভালোই সামাল দিয়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে উন্নতি দেখে এডিবি উৎসাহ পাচ্ছে বলেও জানান মনমোহন।

উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পূর্বাভাস সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বেসরকারি ও সরকারি ব্যয়, বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রবাসী আয়সহ অর্থনীতির প্রায় সব খাত বেশ সক্ষম অবস্থানে রয়েছে। আমরা আমাদের সক্ষমতার নিরিখে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা অর্জন করি। এবারও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে প্রমাণ করব যে আমাদের লক্ষ্যমাত্রাই সঠিক।’

 

মন্তব্য