kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

ইতালিতে ‘নিষিদ্ধ’ বাংলাদেশ

খামখেয়ালিপনাই সমস্যা বাড়িয়েছে

মেহেদী হাসান   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খামখেয়ালিপনাই সমস্যা বাড়িয়েছে

ইতালির পাসপোর্টধারী একদল দ্বৈত নাগরিক গত মার্চ মাসে জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে বিশৃঙ্খলা বাধিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) ঝুঁকি সত্ত্বেও তাঁদের অনেকে কোয়ারেন্টিনে থাকেননি। এরপর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বাংলাদেশফেরত আরেক দল ইতালির পাসপোর্টধারী ইতালিতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে আলোচনায় এনেছেন কোয়ারেন্টিন না মেনে। অভিযোগ উঠেছে, ইতালি ফিরে তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ও সংক্রমণে ভূমিকা রেখেছেন। ইতালি সরকার বারবার বলার পরও তাঁরা সতর্ক হননি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভুয়া করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে ইতালির গণমাধ্যমের উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ফেরা প্রায় ২০ শতাংশ যাত্রীর করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইতালি সরকার বাংলাদেশ থেকে যাত্রী যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ইতালি যে বাংলাদেশিদের ঢুকতে না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে তাঁদের প্রায় সবাই বাংলাদেশের পাশাপাশি ইতালির রেসিডেন্ট পারমিটধারী। অনেকে ইতালির পাসপোর্টধারী নাগরিকও। অর্থাৎ তাঁদের নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য বাংলাদেশের নাগরিক নয়। বরং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীরা। এর আগে করোনা মহামারি মোকাবেলায় দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানেও বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঢাকায় জাপান দূতাবাস বলেছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, আরো ১১৩টি দেশ থেকে যাত্রী প্রবেশের ওপর জাপান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আর এটি করা হয়েছে কভিড-১৯ পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীদের শরীরে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়াও সতর্কতামূলক বাংলাদেশ থেকে যাত্রী প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। জানা গেছে, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশফেরত যাত্রীরা কিভাবে, কোথায় কভিড-১৯ সংক্রমিত হলেন তা নিশ্চিত নয়। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ তালিকায় রাখা হয়েছে।

ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার রাতে এক আদেশে বাংলাদেশ ছাড়াও কভিড-১৯-এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মোট ১৩টি দেশ থেকে যাত্রী প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—আর্মেনিয়া, বাহরাইন, ব্রাজিল, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, চিলি, কুয়েত, উত্তর মেসিডোনিয়া, মালদোভা, ওমান, পানামা, পেরু ও ডমিনিক প্রজাতন্ত্র। ইতালি যাত্রার আগে ১৪ দিনের মধ্যে কেউ বাংলাদেশসহ এই ১৩টি দেশে অবস্থান বা ট্রানজিট করলে তাঁকে ইতালিতে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

ইতালির স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্তো স্পেরাঞ্জা বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইতালির জনগণ যে ত্যাগ করেছে তা বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। 

ইতালির হায়ার হেলথ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট সিলভিয়ো ব্রুসাফেরা বলেছেন, ইতালির স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেওয়া এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাইরে থেকে আসা লোকদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমিত হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তা ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে করোনা সংক্রমণের হার এখনো অনেক বেশি।

এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মাত্র ১৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য সীমিত পরিসরে সীমান্ত খুলেছে। ওই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র নেই। চীনকে ওই তালিকায় রেখে বলা হয়েছে, চীন যদি তার দেশে ইইউর নাগরিকদের ঢুকতে দেয়, তবেই ইইউতে চীনাদের ঢুকতে দেওয়া হবে। অর্থাৎ মহামারি পরিস্থিতির পাশাপাশি ‘রেসিপ্রোসিটির’ (পারস্পরিক সুবিধা প্রদান) মতো বিষয়ও এখানে আছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ যখন তার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোয় নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ রেখেছিল, তখন ইউরোপীয় অনেক দেশই তাদের নাগরিকদের ফেরাতে নিয়মিত ফ্লাইট চালুর জন্য চাপ দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সেই চাপে রাজি না হয়ে বিশেষ ফ্লাইটের সুযোগ দিয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে যাত্রী ও ফ্লাইট যাওয়া নিষিদ্ধ হওয়া বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। এর পাশাপাশি উত্তেজনা বাড়িয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর খবর।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তে বাংলাদেশিদের বহনকারী ফ্লাইটকে ‘ভাইরাস বোমা’ বলে অভিহিত করেছেন বলে খবর বেরিয়েছিল। এ নিয়ে অস্বস্তির পর গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী কখনো এ ধরনের কথা বলেননি। স্প্যানিশ এক টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, রোম বিমানবন্দরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একটি ফ্লাইটেই প্রায় ২০ শতাংশ যাত্রীর করোনা ধরা পড়ে। ইতালি আবারও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না বলে বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট যাওয়া বন্ধ করেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের আরো ১২টি দেশের ক্ষেত্রেও ইতালি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার তা আবার পর্যালোচনা করা হবে।

জানা গেছে, গত এক মাসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ছয়টি বিশেষ ফ্লাইটে প্রায় এক হাজার ৬০০ বাংলাদেশি ইতালিয়ান রেসিডেন্ট পারমিটধারী বা পাসপোর্টধারীকে ইতালি নিয়ে গেছে। ঢাকায় ইতালির কূটনীতিকরা এ ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে রোম বিমানবন্দরে ৭০ থেকে ৭৫ জনের করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। এর বাইরে ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের আরো ২০ থেকে ২৫ জনের করোনা শনাক্ত করেছে। সার্বিকভাবে পরিস্থিতি ইতালি সরকারের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

 

মন্তব্য