kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা

যন্ত্রণাময় জীবনের প্রতিরোধ থমকে গেল ব্রাশফায়ারে

কূটনৈতিক ও নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যন্ত্রণাময় জীবনের প্রতিরোধ থমকে গেল ব্রাশফায়ারে

প্রায় দুই সপ্তাহ আগে কাজের খোঁজে লিবিয়ার বেনগাজি থেকে অন্যত্র যাচ্ছিলেন প্রায় অর্ধশত শ্রমিক। বেশির ভাগই বাংলাদেশি। পথিমধ্যে মরুভূমিতে জিম্মি করে মানবপাচারকারী মিলিশিয়া চক্র। এরপর তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ত্রিপোলির দিকে। মিজদাহ শহরে পৌঁছার পরই মুক্তিপণের জন্য তাঁদের ওপর শুরু হয় বর্বর নির্যাতন। সেই যন্ত্রণার ইতি টানতে হঠাৎ সুযোগ বুঝে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন জিম্মি কর্মীরা। এতে সেই নির্যাতনকারী লিবীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়। আর এর প্রতিশোধ নিতে পাচারকারী দলের অন্য সদস্যরা ওই জিম্মি কর্মীদের লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। এতে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন নিহত হন। গুলিতে আহত হন আরো ১১ বাংলাদেশি। ভাগ্যক্রমে অক্ষত থাকা একমাত্র বাংলাদেশি এক লিবীয় নাগরিকের অধীনে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। তিনিই ফোনে ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ দূতাবাস।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল শুক্রবার দুপুরে এক ভিডিও বার্তায় ওই বাংলাদেশিদের লিবিয়াযাত্রার পেছনে দালাল ও পাচারকারীদের তৎপরতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, মিজদাহর ঘটনায় অক্ষত বাংলাদেশি জানিয়েছেন যে পাচারকারীরা আরো টাকা চাচ্ছিল। একেক জন আট হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার (প্রায় সাত-আট লাখ টাকা) দিয়ে গেছেন। ওরা আরো টাকা চাচ্ছিল ও খুব অত্যাচার করছিল। কিন্তু তাঁরা দিতে রাজি হননি। এতে বচসা হয়। তখন একজন আফ্রিকান লোক মূল  পাচারকারীকে মেরে ফেলে। এর পরই ওই পাচারকারীর পরিবারের সদস্য ও অন্য পাচারকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি করে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অক্ষত একমাত্র বাংলাদেশি অজ্ঞাত একটি স্থানে আছেন। ওই ঘটনার পর তিনি একটি ফার্মেসিতে ছিলেন। পাচারকারীরা ওই ফার্মেসি তছনছ করে দেয়। কিন্তু তিনি কোনোমতে লুকিয়ে আছেন। তিনি তাঁর খবর পরে জানাবেন।

এদিকে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে লিবিয়ায় অন্তত ২৬ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে মিজদাহতে অপহরণকৃত বাংলাদেশিদের ওপর গত বৃহস্পতিবার এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছে লিবিয়ার মিলিশিয়ারা। ১১ জন বাংলাদেশি হাতে-পায়ে, বুকে-পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিজদাহ হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মৃতদেহগুলো তাঁরা মিজদাহ হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। পরে আহতদের দূতাবাসের সহায়তায় উন্নততর চিকিৎসার জন্য ত্রিপোলির বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গুরুতর আহত তিনজনের শরীর থেকে গুলি বের করার জন্য অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাস লিবিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে। তারা আহত ব্যক্তিদের জন্য সম্ভাব্য সহায়তা দিচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লিবিয়ায় বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা আহতদের কাছ থেকে ঘটনার বিশদ বিবরণসহ নিহতদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে দূতাবাসকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, আহতদের কাছ থেকে জানতে পারব তাঁরা কোন জেলার, কাদের মাধ্যমে ও কোন পাচারকারীদের মাধ্যমে গেছেন।

তিনি বলেন, এমন ঘটনা এটিই প্রথম নয়। পাচারকারীরা সক্রিয় থাকলে ভবিষ্যতেও এর পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা আছে।

অন্যদিকে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, লিবিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের বেশির ভাগের বাড়ি মাদারীপুর ও আশপাশের জেলায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, পাঁচ বছর ধরে লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো বন্ধ। এর পরও কিভাবে বাংলাদেশি কর্মীরা সেখানে যাচ্ছেন তা তদন্ত হওয়া উচিত।

ডিসেম্বরে বেনগাজি, লক্ষ্য ছিল সাগরপথে ইতালি : ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) আশরাফুল ইসলাম গতকাল জানান, ওই ৩৮ বাংলাদেশি মূলত ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যেই লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। করোনাভাইরাসসংক্রান্ত জটিলতা শুরু হওয়ার আগে গত ডিসেম্বর মাসে তাঁরা ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছেন। এরপর কয়েক মাস লিবিয়ার ভেতরে তাঁদের রাখা হয়েছিল। বেনগাজি থেকে উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারায় নিয়ে পরে সেখান থেকে তাঁদের ইতালিতে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের।

বাংলাদেশি ওই কর্মকর্তা জানান, বছরের এই সময়টা সাগর শান্ত থাকে। তাই পাড়ি দেওয়ার জন্যই এটিকেই আদর্শ সময় বলে মনে করা হয়। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় ত্রিপোলি হয়ে যুওয়ারায় যাওয়ার যে পথ তাতে অনেক তল্লাশিচৌকি রয়েছে। তাই সেই পথ এড়িয়ে বিপজ্জনক পথে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আর সে সময়ই তাঁরা অপহরণকারী মিলিশিয়াদের কবলে পড়েন।

হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও রকেট : প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিবিয়ার সংবাদমাধ্যম আল-ওয়াসাত জানিয়েছে, অজানা কারণে শুরু হওয়া এক বিদ্রোহে মানবপাচারকারী হিসেবে পরিচিত লিবীয় নাগরিক মোহাম্মদ আবদুল রহমান মারা যান। এরপর তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওই ভবনটি ঘেরাও করে এবং মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করে। একপর্যায়ে ওই ভবনের প্রায় ১০০ অভিবাসী আত্মসমর্পণ করে ভবনের বাইরে বেরিয়ে এলেও প্রায় ৪০ জন ভবন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও রকেট দিয়ে হামলা করার পর ভবনের ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা নিহত হন।

বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়েছে বাংলাদেশ : ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাস গত বৃহস্পতিবার লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পুরো ঘটনার তদন্তসহ এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার, দোষীদের যথাযথ শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিজদাহের সুরক্ষা বিভাগকে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সব পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুততম সময়ে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, মানবপাচারে জড়িতদের বিবরণ এবং এ বিষয়ে লিবীয় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।

মিজদাহয় যুদ্ধাবস্থা : ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মিজদাহ শহরে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ওই অঞ্চলটি এখন দুটি শক্তিশালী পক্ষের যুদ্ধক্ষেত্র। কিছুদিন আগে ত্রিপোলিভিত্তিক ও জাতিসংঘ সমর্থিত জাতীয় ঐক্যের সরকার (জিএনএ) অঞ্চলটি দখল করে নেয়। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল হাফতারের নেতৃত্বাধীন পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সরকারি বাহিনী দুই দিন আগেও শহরটিতে বোমাবর্ষণ করেছে। এ অঞ্চলে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল খুবই কম। বিরোধী পক্ষ মাঝেমধ্যে ত্রিপোলি শহরেও বোমাবর্ষণ করে থাকে। দুটি শক্তিশালী পক্ষ সেখানে যুদ্ধরত থাকায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক নয়।

এ কারণে অধিকাংশ দেশ তাদের দূতাবাস তিউনিশিয়ায় সরিয়ে নিলেও ত্রিপোলিতে বাংলাদেশসহ মাত্র তিনটি দেশের দূতাবাস সচল রয়েছে। প্রতিকূল অবস্থায়ও বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা