kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

ধর্ষণ কমছেই না

আশরাফ-উল-আলম, রেজোয়ান বিশ্বাস ও তানজিদ বসুনিয়া

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধর্ষণ কমছেই না

‘মানুষ তার নিজের বাসায় যেভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে, আমরাও সে রকমই ছিলাম। বাসায় ঢুকে কেউ আমাদের ধর্ষণ করবে কখনো ভাবতেও পারিনি।’ গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কদমতলী থানার জুরাইনের একটি বাসায় দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশের কাছে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে মামলার বাদী।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর ছামাদনগর এলাকায় গার্মেন্টের কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে অস্ত্রের মুখে রাস্তা থেকে তুলে পাশের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করে চারজন।

গত ৭ জানুয়ারি ফেনী শহরের রামপুর এলাকায় একটি বাসায় চার তরুণীকে আটকে রেখে জনৈক কাওসার বিন কাশেম তার সহযোগীদের নিয়ে ধর্ষণ করে। তরুণীরা বাধা দিলে তাদের শরীরে সিগারেটের ছেঁকা, বৈদ্যুতিক শক ও মারধর করা হয় বলে ফেনী শহরের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান।

নিজের স্ত্রীকে অন্য পুরুষ দিয়ে ধর্ষণ করিয়ে, স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বগুড়া শহরের চরলোকমান এলাকায়। ১৫ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনা ঘটে। ভোলায় অটোরিকশা থামিয়ে দুই সন্তানের মাকে নামিয়ে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে। একই দিন ভোলার কুকরিমুকরিতে এক যুবতীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে পাঁচ যুবক ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় খেলা করার সময় তুলে নিয়ে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই দিন দুপুর ২টার দিকে শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

এসব ঘটনা এ বছরের প্রথম ৪২ দিনের। নতুন বছরের শুরুতে রাজধানীতে মহাসড়কের পাশে ঝোপের আড়ালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় কিছুদিন সমাজের সবাই তটস্থ থাকলেও ধর্ষণের সংখ্যা কমেনি। এমনকি এর কিছুদিনের মধ্যে রাজধানীতেই

পৃথক তিনটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর শিকার হয়েছে পাঁচ কিশোরী। চলতি মাসে ঢাকার বাইরে অনেক ঘটনার মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ও গাজীপুরে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে ট্রাকে উঠিয়ে এক তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায়ও মানুষ হতভম্ব হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনা অতীতের সব হিসাব ছাড়িয়ে গেছে গত দুই বছরে। এই দুই বছরে সাত হাজার ৪৪৪ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র জমা পড়েছে তিন হাজার ৯৯৮টি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ৮০৬টি।

গত সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরে মাসিক অপরাধ সভায় জানানো হয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত জানুয়ারি মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়। যা বিগত সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ধর্ষণ প্রতিরোধে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম  বিভিন্ন  পেশাজীবীকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন।

১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০১৯ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির তথ্য মতে, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু। এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩৭ জন। এ সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৭ জনকে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১৯ জন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৪৫ জনকে। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে ৯১ জন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৮৫ জন। উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ১০৪ জনকে। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১৭ জন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, গত বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ও শিশু। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৮১৮ জন। ২০১৯ যৌন হয়রানির শিকার ১৮ নারী আত্মহত্যা করে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছে। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ পুরুষও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

শিশু ধর্ষণের ভয়াবহতা নিয়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯০২টি শিশু। হত্যা করা হয়েছে ২৬৬ শিশুকে। ধর্ষণের সময় হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ২৮০টি শিশুকে। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৩৫৬টি শিশু এবং হত্যা করা হয় ২২৭ জনকে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে তিন গুণ। পরিসংখ্যান মতে, সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা জেলায়। দ্বিতীয় অবস্থানে নারায়ণগঞ্জ আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা জেলা।

ধর্ষণের বর্তমান পরিসংখ্যান বলে দেয় এ দেশে ধর্ষণ মহামারির রূপ ধারণ করেছে। ধর্ষণের ধরনও পাল্টেছে। জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে বাসায় এনে ধর্ষণ, চলন্ত বাসে ধর্ষণ, রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, রাতে বাসায় ঢুকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণসহ এমন কোনো পন্থা নেই যা করা হচ্ছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের আন্দোলন, নারীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন কোনো কিছুই থামাতে পারছে না নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা। খোদ আইন প্রণেতারাও ধর্ষণের ভয়াবহতায় উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ ধর্ষকদের ধরে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন সংসদে। কিন্তু ধর্ষকদের মনে ভয় ধরাতে পারছে না কেউ।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকাসহ অভিভাবকদের সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে না রাখা বা পরিবারের অভিভাবকদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণ বেড়েই চলেছে।

আইন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুবই কম। যদিও বিভিন্ন সময় ধর্ষণের ঘটনায় বেশ কিছু অভিযুক্তের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। আইনসংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযুক্তদের যথাযথ শাস্তি না হওয়া, আইনের শিথিলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতার ব্যাপক প্রসার ও সহজলভ্যতার কারণে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন থামানো যাচ্ছে না।

মানবাধিকারী নেত্রী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করেন ধর্ষণের হার বৃদ্ধির। আবার নারীর চেয়ে পুরুষের ক্ষমতা, ধর্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়, সমাজের প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার বিলম্ব হয় উল্লেখ করে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সবাইকে যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে। না হলে সমাজের এই মারাত্মক অপরাধের প্রবণতা কমবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে যখন নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির সকল সহায়ক পরিবেশ বজায় থাকে, তখন ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধি বাড়তেই থাকে। নারীর প্রতি সম্মান জানানোর পারিবারিক শিক্ষা ঠিকমতো না পাওয়া, বিনোদনের জায়গাগুলো সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা ও সামাজিক মূল্যবোধ কমে যাওয়ায় এ ধরনের ব্যাধি বেড়েই চলেছে। এই সামাজিক সমস্যা নিরসনে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন কঠোর শাস্তির বিধান করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা