kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার ফুলে গতকাল ভরে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রভাতফেরিতে অংশ নিতে সারি সারি মানুষ দাঁড়িয়ে। সবার হাতে পুষ্পার্ঘ্য। শোকের কালো পোশাক আর ব্যাজ পরে আলপনা আঁকা নানা পথ হয়ে জনতা এগিয়ে যাচ্ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে। মুখ থেকে মুখে সুরে সুরে ফিরছিল, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। ভাষাশহীদদের প্রতি অতল শ্রদ্ধা বুকে ধারণ করে খালি পায়ে তারা ভিড়ের মধ্যে অধীর অপেক্ষায়। কোলে ছোট শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন মা-বাবারাও। সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে চলে একটা সময়ে তাঁরা শহীদ বেদিতে অর্পণ করেন শ্রদ্ধার ফুল।

ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসেছেন ভিনদেশিরাও। ভারতের চন্দননগরের হুগলি থেকে টানা ছয় দিন বাইসাইকেল চালিয়ে ৫৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন অনুপ রায়। বললেন, ‘শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পেরে ভালো লাগছে।’ এসেছিলেন জাপানি নাগরিক তোসুমি। তাঁদের কণ্ঠেও ছিল বাংলার ভাষাশহীদদের স্মরণে রচিত সেই গানের সুর।

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে আসতে থাকে জনতার স্রোত। গতকাল শুক্রবার মধ্যদুপুরেও দেখা গেছে জনতার সারি। শ্রদ্ধার ফুলে ভরে ওঠে শহীদ মিনারের বেদিমূল।

রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তাঁরা সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর প্রথমে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রীবর্গ ও দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলের সংসদ সদস্যরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা সকাল সাড়ে ৯টায় ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষে মেয়র সাঈদ খোকন ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শহীদ বেদিতে। জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির নেতারা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধান, মহাপুলিশ পরিদর্শক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক। শ্রদ্ধা জানায় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল।

প্রথম প্রহরেই শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশি সংস্থার প্রধানরা।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম আখতারুজ্জামান অন্যদের নিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান সকাল সাড়ে ৭টায়। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের নেতৃত্বে।

গতকাল ছিল সাধারণ ছুটি। ভাষাশহীদদের স্মরণে অর্ধনমিত ছিল জাতীয় পতাকা। শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের সঙ্গে জাতি দিনটি নানা আনুষ্ঠানিকতায় পালন করে।

শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিভিন্ন সংগঠন : একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ শ্রদ্ধা জানানোর পর উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। এরপর একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সংসদ ও হল কর্তৃপক্ষ, পূজা উদ্যাপন পরিষদ, বৌদ্ধ ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, স্বেচ্ছাসেবক ধারা, বিশ্ব বাঙালি সংঘ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী পাদুকা শিল্প শ্রমিক সংহতি, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী সংগ্রাম পরিষদ, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরাম, জাতীয় কবিতা পরিষদ, হিমু পরিবহন, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন, বিশ্ব বাঙালি সংঘ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশনা-বিক্রেতা সমিতি, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বিজয় একাত্তর হল, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, জাতীয় জনতা পার্টি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), জাতীয় হকার্স লীগ ঢাকা মহানগর, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, তমদ্দুন মজলিস প্রভৃতি সংগঠন।

গতকাল আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির আয়োজনসহ দেশের সব উপাসনালয়ে ভাষাশহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।

এ ছাড়া বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, তিন পার্বত্য জেলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রন্থমেলা, আলোচনাসভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা