kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হুমকি-হামলায় বাড়ছে শঙ্কা

রেজোয়ান বিশ্বাস    

২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হুমকি-হামলায় বাড়ছে শঙ্কা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই বাড়ছে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে প্রতিপক্ষ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা। এরই মধ্যে কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগকারী প্রার্থীরা বলছেন, ভোটের দিন তাঁদের কর্মী ও সমর্থকদের কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে তাঁরা শঙ্কায় আছেন।

ঢাকার দুই সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদে অন্তত ১২০ জন প্রার্থী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীদের হুমকির মধ্যে আছেন। অভিযোগকারীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, বিএনপি সমর্থিত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ও তাঁদের লোকজন নির্বাচন থেকে সরে যেতে হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

অভিযোগকারী প্রার্থীরা বলছেন, তাঁদের ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রচারে বের হলে ঘিরে ধরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কর্মীদের মারধর করে প্রচারে না যেতেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এরই মধ্যে বিভিন্ন থানায় এবং নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রার্থী। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ পাওয়ার পর শতাধিক প্রার্থীকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থীই বেশি।

নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।’

ঢাকার দুই সিটির ভোট হবে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৪ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ৫৭৪ জন। এর মধ্যে ডিএনসিসিতে ৪১টি এবং ডিএসসিসিতে ২৯টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। অন্যদিকে ডিএনসিসিতে ১৭ এবং ডিএসসিসিতে ১২ জন বিদ্রোহী আছেন বিএনপির।

গত শনিবার একটি সূত্রে জানা যায়, ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ১০৩টি অভিযোগ পেয়েছেন রিটার্নিং অফিসাররা। এসব অভিযোগের বেশির ভাগই এসেছে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের কাছ থেকে। পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, প্রচারে বাধা, অতিরিক্ত নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন, মাইক ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় এসব অভিযোগ এসেছে। মেয়র পদপ্রার্থীদের অভিযোগ এসেছে শুধু বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ থেকে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের দাবি, বেশির ভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। শুধু ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগগুলো পুলিশের কাছে পাঠানো হয়।

গত ১২ জানুয়ারি ওয়ারীতে ডিএসসিসির ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মেহেরুন নেছার বাসা ও কার্যালয়ে হামলা হয়। মেহেরুন নেছা গত শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোটের মাঠে নীরব সন্ত্রাস চলছে। প্রতিপক্ষ আমাকে ঠিকমতো প্রচার চালাতে দিচ্ছে না। আমার লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। পুলিশকে হুমকির বিষয়ে মৌখিক অভিযোগ দিয়েছি। ইসিতে দিয়েছি লিখিত অভিযোগ। তবে সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছেই। এভাবে চলতে থাকলে ভোটের দিনও ব্যাপক হট্টগোল হতে পারে।’ তাঁর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ারী থানার ওসি মো. আজিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে।’

মেহেরুন নেছা বলেন, পুলিশ আশ্বাস দিলেও সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া। প্রতিপক্ষ প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষ কে, জানতে চাইলে মেহেরুন নেছা বলেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ মান্নাফী। তবে তাঁর অভিযোগ অস্বীকার করে মান্নাফী বলেছেন, ‘মেহেরুন নেছার অভিযোগ সত্য নয়। আমি বা আমার লোক কাউকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে না।’

মেহেরুন নেছার অভিযোগ এবং এলাকার সার্বিক পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাহ ইফতেখার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোবাইল ফোনে ও ভোটের মাঠে হুমকি পেয়ে মেহেরুন নেছা সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ মান্নাফীকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে।’

ডিএসসিসির ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁকে প্রতিনিয়ত ফোনে হুমকি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ স ম ফেরদৌস আলমের লোকজন। এ বিষয়ে থানায় মৌখিক অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। তবে ফেরদৌস আলম বলেন, তিনি কাউকে কোনো হুমকি দেননি।

ডিএনসিসির ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জাহাঙ্গীর মোল্লার বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আলী হোসেন। একই সিটির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হাবিবুর রহমান রাব্বীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে দলের বিদ্রোহী সৈয়দ একরাম হোসেনের বিরুদ্ধে। একই সিটির ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মনির চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, দলের সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মুক্তার সরদারের লোকজন তাঁকে হুমকি দিয়ে প্রচার চালাতে দিচ্ছে না। তিনি অনেকটা ঘরবন্দি হয়ে আছেন। ভোটের দিন তাঁর কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্রে যেতে পারবে কি না, এ শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। মনির চৌধুরী বলেন, তিনি পুলিশ ও ইসির কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল রবিবার ফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করলেও মুক্তারের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

উত্তর সিটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এসেছে দলের সমর্থন পাওয়া প্রার্থী সালাউদ্দিন রবিনের লোকজনের বিরুদ্ধে।

ডিএনসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী তারিকুল হক সজীব, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আলাউদ্দিন, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে বিল্লাল শাহ এবং ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে দেলোয়ার হোসেন খান দলের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ করেছেন।

এমন অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ যাঁদের সতর্ক করেছে তাঁদের মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ও তাঁদের লোকজনই বেশি। মতিঝিল বিভাগের আটটি থানা এলাকার ১৭ জন, ওয়ারীর সাতটি থানা এলাকার ১৫ জন, রমনার ছয়টি থানা এলাকার ১৩ জন, মিরপুরের ছয়টি থানা এলাকার ১৪ জন, উত্তরার সাতটি থানা এলাকার ১৭ জন, লালবাগ এলাকার ১৪ জন এবং গুলশান এলাকার আটজনকে সতর্ক করা হয়েছে।

ডিএমপির রমনা বিভাগের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘প্রার্থীদের কোনো অভিযোগ থাকলে ইসিতে জানাচ্ছেন। পরে ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর প্রচার ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে। গত শুক্রবার ডিএসসিসির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মো. সাইদুর রহমান রতনের নির্বাচনী ক্যাম্প পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁর অভিযোগ, প্রচার চালাতে গেলে তাঁর কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেনের লোকজন ওই ঘটনায় জড়িত বলে রতন কালের কণ্ঠকে জানান।

একই সিটির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিল্লাল সরদারের ওপর এরই মধ্যে দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেনের ক্যাডার হানিফ, জাহাঙ্গীরসহ আরো কয়েকজন তাঁর ওপর হামলা চালায়। তবে তাঁর অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিল্লালের লোকজন আমার লোকজনকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিচ্ছে। প্রচারে বের হলে আশপাশ থেকে হুমকি দিচ্ছে।’

গত বুধবার ডিএনসিসির ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের বেরাইদে দুই কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই পক্ষের ৯ জন আহত হয়েছে।

সম্প্রতি গাবতলীতে প্রচার চালাতে গেলে ডিএনসিসিতে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের ওপর হামলা হয়। ওই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করার খবর পাওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ক্যাসিনোকাণ্ডে নাম আসা মোমিনুল হক সাঈদের সমর্থনে তাঁর ক্যাডার বাহিনী এলাকায় মহড়া দিতে শুরু করেছে। ডিএসসিসির ১ নম্বর ওয়ার্ডের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাহাদত হোসেন সাধুর পক্ষেও অপরাধীদের তৎপরতা আছে। সাধু সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি ক্যাসিনোকাণ্ডের অন্যতম হোতা খালেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী; যদিও সাধু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা অস্বীকার করেছেন।

মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিঝিল, শাহজাহানপুর ও খিলগাঁওয়ের ভোটের মাঠে তৎপর রয়েছেন ঢাকার অপরাধজগতের পরিচিত নাম সোহেল। তিনি কানাডা থেকে দেশে ফিরেছেন। সোহেল ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে এক প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। এ ছাড়া আরো শতাধিক স্থানীয় সন্ত্রাসী ভোটের মাঠে আছে। দেশে থাকা সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি বিদেশে এবং কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীরাও তৎপর। তাদের মধ্যে আলোচিত বিদেশে থাকা জিসান এবং কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাসসহ কয়েকজনের সহযোগীরা নির্বাচনের মাঠে রয়েছে।

ডিএমপির আটটি ক্রাইম জোনের ডিসিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যত দিন যাচ্ছে ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নির্বাচনের মাঠ।

র‌্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, যেসব ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী কাউন্সিলর পদপ্রার্থী রয়েছেন, সেখানে মূল প্রার্থীদের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে বড় রকমের দ্বন্দ্ব চলছে। এ কারণে এরই মধ্যে কোথাও কোথাও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই সব ওয়ার্ডে ভোটের দিন পর্যন্ত হামলা-সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে তারা। সে কারণে তারা নজরদারি বাড়িয়েছে।

ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন কালের কণ্ঠকে বলেন, সন্ত্রাসীচক্রের হাতে কী পরিমাণ অস্ত্র আছে তার খোঁজ চলছে। আগে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের অনেক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি সেগুলো উদ্ধার এবং যারা গ্রেপ্তার হয়নি তাদের ধরার চেষ্টা চলছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা