kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

চোয়াল ও কাঁধ দিয়ে লিখে জিপিএ ৫

লিতুনের মুখে হাসি ফোটাল বসুন্ধরা গ্রুপ

ফিরোজ গাজী ও মোহাম্মাদ বাবুল আকতার মণিরামপুর (যশোর)   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লিতুনের মুখে হাসি ফোটাল বসুন্ধরা গ্রুপ

প্রকৃতির খেয়ালের অন্ত নেই। যশোরের মণিরামপুর উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার পূর্বে খানপুর ইউনিয়ন। ওই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম শেখপাড়া খানপুর। ২০০৮ সালের ২৫ জুন ওই গ্রামের দরিদ্র হাবিবুর রহমানের স্ত্রী জাহানারা বেগম জন্ম দেন একটি কন্যাশিশু। শিশুটির হাত-পা নেই। অর্থাৎ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। বিচলিত হলেও ভেঙে পড়েননি এই দম্পতি। শিশুটির নাম রাখা হয় লিতুন জিরা।

প্রথম দিকে গ্রামের লোকদের মুখে লিতুনকে নিয়ে অনেক বিরূপ মন্তব্য। কিন্তু সাহস হারাননি তার মা-বাবা। ধীরে ধীরে তাঁরা টের পেলেন তাঁদের কন্যাশিশুটি অসম্ভব মেধাবী। বুদ্ধি অন্য স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় অনেক বেশি। গ্রামের লোকেরাও বিরূপ মন্তব্য বন্ধ করে ভালোবাসতে শুরু করেন লিতুনকে। তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় পাড়ার মক্তবে। পরে খানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পায় লিতুন।

বর্তমানে স্থানীয় গোপালপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। অদম্য মেধা আর ইচ্ছাশক্তি তার। হাত-পা না থাকায় চোয়াল এবং কাঁধের সহযোগিতায় লেখে লিতুন। পড়ালেখায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শুধু ক্লাসে ফার্স্ট নয়, স্কুলও ফার্স্ট হয়েছে। লেখাপড়া শিখে সমাজে অন্যদের মতো মানুষ হতে চায় লিতুন। কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম লিতুনকে নিয়ে বেশ কটি খবরও প্রকাশ করে।

গতকাল শনিবার লিতুন ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ছিল স্মরণীয় একটি দিন। গতকাল দুপুরে লিতুন জিরার বাড়িতে গিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফিয়াত সোবহানের পক্ষে বসুন্ধরা গ্রুপের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (হেড অব বাল্ক সেলস) রেদোয়ানুর রহমান লিতুন জিরাকে পাঁচ লাখ টাকার চেক, স্কুল ব্যাগ এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। এ সময় বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ও বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রডাক্ট লিমিটেডের উইং ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান, বসুন্ধরা গ্রুপের বাল্ক সেলসের ডেপুটি ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম, ডিভিশনাল সেলস ইনচার্জ জি এম কামরুজ্জামান, এরিয়া সেলস ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম, টেরিটরি সেলস এক্সিকিউটিভ রঞ্জু সরকার উপস্থিত ছিলেন।

লিতুন জিরার জন্য চেক ও উপহার সামগ্রী প্রদান করে রেদোয়ানুর রহমান বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে। বসুন্ধরা গ্রুপ প্রতিবন্ধীদের সেবা, তাদের কল্যাণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে কাজ করছে। লিতুন জিরার পরিবার চাইলে তাকে বসুন্ধরা গ্রুপে সংযুক্ত করে নেওয়া হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিতুন জিরার লেখাপড়া, ভবিষ্যতের সকল দায়িত্ব নেওয়ার আবেদন করা হলে বসুন্ধরা গ্রুপের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করা হবে।’

আপ্লুত লিতুন জিরা বলে, ‘বসুন্ধরা খাতাতেই আমি লিখি। বসুন্ধরা গ্রুপের স্যারেরা ঢাকা থেকে আমাদের বাড়িতে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাঁচ লাখ টাকার চেক, স্কুল ব্যাগ, আমার পরিবারের সবার জন্য অনেক উপহার সামগ্রী দিয়েছেন। বসুন্ধরা গ্রুপের স্যারদের অনেক ধন্যবাদ জানাই। আমি খুব খুশি। আমার জীবনে স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে এই দিন।’

লিতুন জিরার বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে। তাঁরা আমার বাড়িতে এসে আমার সন্তান ও আমার পরিবারের জন্য পাঁচ লাখ টাকার চেকসহ অনেক উপহার সামগ্রী দিয়েছেন। আমাদের খোঁজখবর নিয়েছেন। আমরা চাইলে ভবিষ্যতে লিতুন জিরার জন্য সব কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমি ও আমার পরিবার বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে ঋণী।’

লিতুন জিরার সহপাঠী মুন্নী আক্তার জানায়, লিতুন তাদের অনেক ভালো বন্ধু। সে খুব মেধাবী। তারা কোনো পড়া বুঝতে না পারলে লিতুনের কাছ থেকে বুঝে নেয়। তারা সবাই লিতুনকে ভালোবাসে। লিতুনও তাদের ভালোবাসে।

খানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজেদা খাতুন বলেন, ‘লিতুন জিরা অসম্ভব মেধাবী। সে তার শ্রেণিতে শুধু প্রথম নয়, স্কুলের মধ্যেও প্রথম ছিল। শুধু লেখাপড়া নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অন্যদের চেয়ে ভালো করে সে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা