kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সর্বোচ্চ আদালতেও জামিন পাননি খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সর্বোচ্চ আদালতেও জামিন পাননি খালেদা জিয়া

ফাইল ছবি

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতভাবে এই আদেশ দেন।

আদালত খালেদা জিয়ার সম্মতি নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের আদেশের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আদালত জামিন দেবেন। কিন্তু তা দেননি। এটা নজিরবিহীন। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতের জন্য এটা কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।’

আরেক আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আপিল বিভাগে সিসি ক্যামেরা বসানোসহ গত কয়েক দিনের কার্যক্রম দেখে আগেই আইনজীবীদের একটা ধারণা হয়েছিল যে খালেদা জিয়াকে জামিন দেবে না। আজকের আদেশে সেটাই প্রমাণিত হলো।’ তিনি বলেন, আদালত কী কারণে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করেছেন, তা বলেননি। তাই লিখিত আদেশ পাওয়ার পর সিনিয়র আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত প্যানেলে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মেডিক্যাল বোর্ড আদালতকে জানিয়েছে, খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসা শুরুর অনুমতি দিচ্ছেন না বলেই বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ তাঁর উন্নত চিকিৎসায় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তাঁর অনুমতি পাওয়া গেলেই চিকিৎসা শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুই পক্ষের শুনানি : গতকাল সকাল ৯টা ৫ মিনিটে আদালত বসার পরই খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আদালত কক্ষ সরকারপক্ষের আইনজীবীতে ভরে গেছে। কিন্তু আমাদের আইনজীবীদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বাইরে শত শত পুলিশ। মনে হচ্ছে সন্ত্রাসীরা যাচ্ছে।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত, আপিল বিভাগের তালিকাভুক্ত আইনজীবী ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না।’

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, ‘উভয় পক্ষের ২০ থেকে ৩০ জন করে থাকার অনুমতি দিতে পারেন। আমরা সকলেই বেরিয়ে যাই। তারা ৩০ জনের তালিকা দিক, আমরাও দেই। সেই স্লিপ দেখে দেখে ঢুকতে দিক।’ এরপর উভয় পক্ষের ৩০ জন করে থাকার অনুমতি দিয়ে বিচারপতিরা এজলাস থেকে নেমে যান। এরপর সকাল ১০টা ৮ মিনিটে বিচারপতিরা আবার এজলাসে বসেন। কয়েক মিনিট পরই রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষের দেওয়া খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থার মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রধান বিচারপতির হাতে তুলে দেন।

শুনানির শুরুতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, দিন দিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে। তাঁর যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না। এই রিপোর্ট অনুযায়ী যা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে পঙ্গুত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। এভাবে আর ছয় মাস থাকলে হয়তো তাঁর লাশ বের হবে।

মানবিক কারণে খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, ‘যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জামিন দিয়েছেন আপনারা। এ ছাড়া নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তির জামিন দেওয়ার পক্ষে আপনাদের অনেক নজির আছে। জামিন দিলে তিনি পালিয়ে যাবেন না।’

খন্দকার মাহবুব হোসেনও খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কথা জানিয়ে তাঁর জামিন প্রার্থনা করেন।

অন্যদিকে জামিনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, মেডিক্যাল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য সব কিছুই করছে। তাঁর সম্মতি না পাওয়ায় মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর উন্নত চিকিৎসা শুরু করতে পারছে না। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়ার যেসব রোগ তা নতুন নয়। কোনোটি ৩০ বছর ধরে, কোনোটি ২০ বছর ধরে আছে। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, জামিন আবেদনে বলা হয়েছে খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত সাজা হয়েছে। তাদের এই বক্তব্য সত্য নয়। একটি মামলায় ১০ বছর ও আরেকটি মামলায় সাত বছর সাজা হয়েছে। এ সময় আদালত তাঁর কাছে জানতে চান, উভয় সাজা একসঙ্গে চলবে নাকি একটির পর একটি কার্যকর হবে? এ বিষয়ে রায়ে কিছু বলা আছে কি না? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ বিষয়ে রায়ে কিছু বলা নেই। এ কারণে তাঁকে একটির পর একটি সাজা খাটতে হবে। তাঁকে এই দুই মামলায় মোট ১৭ বছর সাজা খাটতে হবে।

এরপর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতকে বলেন, ‘হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের আগের নজির রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রেও হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপনারা যেতে পারেন না।’

দুপুর ১টায় শুনানি শেষে বিচারপতিরা এজলাস থেকে নেমে যান। এরপর সোয়া ১টায় আবার এজলাসে বসে আদেশ দেন। আদালতের আদেশের পর উভয় পক্ষের আইনজীবীরা নীরবে বেরিয়ে যান। এরপর আইনজীবী সমিতি ভবনে এসে দুই পক্ষের আইনজীবীরা পাল্টাপাল্টি মিছিল করেন। 

নিরাপত্তা ব্যবস্থা : খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে গতকাল ভোর থেকেই রাজধানীর শাহবাগ, মৎস্য ভবন, পুরানা পল্টন মোড়, দোয়েল চত্বর, সচিবালয়, প্রেস ক্লাব ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় প্রচুরসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে প্রবেশ পথে তল্লাশি করে আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও অন্যদের ঢুকতে দেওয়া হয়। পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তালিকাভুক্ত আইনজীবী ছাড়া কোনো আইনজীবীকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এজলাসে। তবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়নি। আদালতকক্ষের ভেতরে ও বাইরে গোয়েন্দা সংস্থার অসংখ্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন। 

পরিচয় দিতে নারাজ আইনজীবী প্রিজন ভ্যানে : আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে প্রিজন ভ্যানে আটকে রাখা হয়। সকাল পৌনে ১১টার দিকে হাইকোর্টের মাজার গেট এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে বলে পুলিশের রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আটক ফয়েজ উদ্দিন নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দাবি করে ভেতরে ঢুকতে চান। প্রবেশপথে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজের পরিচয় না দিয়ে ও পরিচয়পত্র না দেখিয়ে পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করায় তাঁকে প্রিজন ভ্যানে তুলে রাখা হয়।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। এই সাজা বাতিল চেয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। শুনানি নিয়ে গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট ওই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের দেওয়া জরিমানার আদেশ স্থগিত করেন। গত ২০ জুন মামলার নথি বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে আসার পর খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আদালতে তুলে ধরেন তাঁর আইনজীবীরা। গত ৩১ জুলাই জামিন আবেদন খারিজ করেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টে জামিন চেয়ে বিফল হয়ে গত ১৪ নভেম্বর আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন খালেদা জিয়া। এই জামিন আবেদনের শুনানিতে গত ২৮ নভেম্বর আপিল বিভাগ বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজনস সেলে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার সর্বশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে জানাতে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে বোর্ডের মেডিক্যাল রিপোর্ট ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দেন। সেদিন (৫ ডিসেম্বর) মেডিক্যাল প্রতিবেদন জমা না পড়ায় শুনানি পিছিয়ে ১২ ডিসেম্বর (আজ) তারিখ ধার্য করেন আদালত। এ নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নজিরবিহীন হট্টগোল হয়।

বিএনপি কার্যালয় ঘিরে পুলিশ : শুনানি সামনে রেখে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে রাখে পুলিশ। গতকাল সকাল ৮টা থেকেই নয়াপল্টনে দলটির কার্যালয়ের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ, যাদের সঙ্গে ছিল সাদা পোশাকের পুলিশও। তবে সকাল ১০টার দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকে নিজের চেম্বারে অবস্থান নেন।

মোটরসাইকেলে আগুনের মামলা ফখরুল-রিজভীসহ আসামি ১৩৫ : শুনানির আগের দিন সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেল পোড়ানোর ঘটনায় শাহবাগ থানায় দুটি মামলা করেছে পুলিশ। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে দুই মামলায়ই আসামি করা হয়েছে বলে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান জানান। তিনি বলেন, একটি মামলায় আসামির সংখ্যা ৭০ এবং অন্যটিতে ৬৫।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা