kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

খোঁড়া যুক্তিতে ওষুধের দাম লাগামছাড়া

► ৫০০ টাকার ট্যাবলেট একলাফে ১২০০
► কম দামি ওষুধও চড়া
► ঔষধ প্রশাসন জানে না, এখন খতিয়ে দেখবে

তৌফিক মারুফ   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খোঁড়া যুক্তিতে ওষুধের দাম লাগামছাড়া

পেঁয়াজের মতো লাফঝাঁপ যেন এবার ওষুধেও শুরু হয়েছে। হঠাৎ বেড়ে গেছে বিভিন্ন ওষুধের দাম; কিন্তু বিষয়টি নজরে পড়েনি খোদ ঔষধ প্রশাসনের। ওষুধ প্রস্তুতকারীদের কেউ বলছে, অন্যের দেখাদেখি তারা দাম বাড়িয়েছে। কেউ বলছে, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি বা উন্নত দেশ থেকে মানসম্পন্ন কাঁচামাল আনার খরচের কথা।

দেশে হাড়ক্ষয়ের রোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি এর ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে অস্টিওপোরোসিসের ওষুধ হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আইব্যান্ড্রনিক এসিড জেনেরিক। দেশের ১৮ থেকে ২০টি কম্পানির এই ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতকরণের অনুমোদন রয়েছে সরকারের কাছ থেকে। এর মধ্যে তিনটি কম্পানি ছাড়া বাকিগুলোর সবাই তৈরি করছে ১৫০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট ফরম্যাট। এত দিন এর প্রতিটি ট্যাবলেট বিক্রি হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। তবে হঠাৎ গত এক থেকে দেড় মাসের ভেতর এই ওষুধের দাম দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গেছে। যেমন অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের ‘বনফিক্স’ ব্র্যান্ডের ওষুধটি ৫০০ থেকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এক হাজার ২০০ টাকা হয়ে যায়। একই জেনেরিকের ‘বন্ড্রোভা’ ব্র্যান্ডের হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধটির দাম বেড়ে এখন এক হাজার ৯৬০ টাকা, ল্যাবএইড ফার্মার ‘বোনাইড’ এক হাজার ৫০০ টাকা।

অ্যান্টিবায়োটিক এজিথ্রোমাইসিন ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ও সিরাপ ফরম্যাটে রয়েছে শতাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের। ট্যাবলেট ও ক্যাপসুলগুলোর কোনোটি ৫০০ মিলিগ্রাম আবার কোনোটি ২৫০ মিলিগ্রাম। গত এক মাসের মধ্যে বেশির ভাগ কম্পানিই গড়ে প্রতি ট্যাবলেটের দাম দুই থেকে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য আগে থেকেও ওষুধের দামে এক কম্পানি থেকে আরেক

কম্পানির হেরফের ছিল কিছুটা। যেমন রেডিয়েন্ট তাদের একোস (৫০০ মিলিগ্রাম) ক্যাপসুলের দাম রেখেছে ৪০ টাকা, অন্যদিকে অপসোনিন একই ওষুধের দাম ৩০ টাকায় বিক্রি করে আসছিল, যা এখন তিন টাকা বেড়েছে।

গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যাল ডায়াবেটিসের মেটফরমিন

 হাইড্রোক্লোরাইড জেনেরিকের ৮৫০ মিলিগ্রামের যে ট্যাবলেট বিক্রি করছে প্রতিটি আড়াই টাকা এবং ৫০০ মিলিগ্রামের দেড় টাকা করে, ওই একই ওষুধ অন্যান্য কম্পানি তিন থেকে পাঁচ টাকা দামে বিক্রি করছে।

গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ অমিপ্রাজলের ক্ষেত্রেও দামের নৈরাজ্য চলছে সমানে। রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস যে ওষুধের দাম রাখছে চার টাকা, সেই একই ওষুধ অন্যরা বিক্রি করছে পাঁচ থেকে ছয় টাকায়।

বেড়েছে ডেক্সমেথাসন+সোডিয়াম ফসফেটের দামও। আগে যা প্রতিটি ৫০ পয়সা থেকে এক টাকার মধ্যে ছিল তা এখন কোনো কোনো কম্পানি দুই টাকায় তুলেছে। চোখের ওষুধ  ডেক্সামেথাসন+ ক্লোরামফেনিকল (৫ এমএল, ০.১%+ ০.৫%) কোনো কম্পানি দাম রাখছে ৫০ টাকা, আবার কেউ রাখছে ৭০ টাকা।

কেবল এই কটি ওষুধই নয়, গত এক মাসের মধ্যে বেশির ভাগ ওষুধ কম্পানিই তাদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো কম্পানি গত ১ ডিসেম্বর থেকে দাম বাড়িয়েছে। জানতে চাইলে অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কখনোই আগে কোনো দাম বাড়াই না। আগে অন্যরা বাড়ায়, তারপর আমরা বাড়াই।’

অন্যদের দেখাদেখি কেন দাম বাড়াবেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যদের চেয়ে দাম কম রাখলে সবাই মনে করে, আমার প্রডাক্টের মান ভালো নয়, নিম্নমানের। তাই আমরা দাম সমন্বয় করে নেই। এ ছাড়া ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, ভালো দেশ থেকে ভালো মানের প্রডাক্ট আনার কারণেও অনেক সময়ে দাম বাড়াতে হয়।’

তবে বাজারে ওষুধের দাম এমনভাবে বাড়ার ব্যাপারে ধারণা নেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমানের। তিনি এমন দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি খোঁজ নিচ্ছি, যদি এমন অসম্ভব কিছু হয়ে থাকে সে জন্য অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ মহাপরিচালক বলেন, অনেক ওষুধের দাম আগে থেকেই বেশি বেশি ছিল, নতুন করে বাড়ানো হয়নি। আবার কোনো কোনো কম্পানি হয়তো গত কয়েক বছরে যেসব ওষুধের দাম বাড়ায়নি, তারা কেউ হয়তো পুরনো ওষুধের দাম কিছুটা বাড়াতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ড. মো. মুনীর উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এই মুহূর্তে ওষুধের দাম বাড়ানোর মতো কোনো কিছু ঘটেনি। একেবারেই অহেতুক এই দাম বাড়িয়েছে একশ্রেণির ওষুধ কম্পানি। সরকারের উচিত বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করা। না হলে মানুষের ভোগান্তি আরো বেড়ে যাবে, চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে চিকিৎসার পেছনে মানুষের যে টাকা খরচ হয় তার ৫০ শতাংশেরও বেশি হয় ওষুধের পেছনে, যা অন্যান্য দেশে ৩০-৩৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। এ অবস্থায় ওষুধের দাম বাড়ানোর ফলে ওই খরচ আরো বাড়বে, আর দুর্ভোগ তো বাড়বেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা