মালয়েশিয়া সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের জন্ম ১৯৭৪ সালের ১৭ আগস্ট। ৪০ বছরের অক্লান্ত শ্রম, মেধার যথার্থ মূল্যায়ন এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পেট্রোনাস এখন ফরচুন গ্লোবাল ৫০০ র্যাংকিংয়ের তালিকায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ করপোরেশন। ৩৫টিরও বেশি দেশের সঙ্গে পেট্রোনাসের সরাসরি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনবিষয়ক ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে। বর্তমানে আলজেরিয়া, ক্যামেরুন, শাদ, মিসর, মৌরিতানিয়া, মোজাম্বিক, বতসোয়ানা, বুরুন্ডি, গ্যাবন, ঘানা, গিনিবিসাউ, কঙ্গো, কেনিয়া, নামিবিয়া, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে, সুদান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করছে তারা। এ ছাড়া যৌথ উদ্যোগে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিউবা, ভেনিজুয়েলা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইরাক, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিনল্যান্ডে কাজ করছে তারা। এবার পেট্রোনাসের দুই বছর আগে জন্ম নেওয়া পেট্রোবাংলার দিকে নজর দেওয়া যাক। ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের ডিগবয় এলাকায় আবিষ্কৃত হয় উপমহাদেশের প্রথম তেলক্ষেত্র। ডিগবয়ের ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকার ব্যাপক মিল থাকায় ১৯০৮ সালে এখানে তেলের খোঁজে অনুসন্ধান চালায় ইন্ডিয়ান পেট্রোলিয়াম প্রসপেক্টিং কম্পানি; কিন্তু এখানে তেলের মুখ দেখেনি তারা। এরপর ১৯২৩ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে মৌলভীবাজারের পাথারিয়ায় দুটি অগভীর কূপ খনন করে বার্মা অয়েল কম্পানি (বিওসি)। তেলের উপস্থিতির সামান্য আভাস পাওয়া গেলেও দুটি কূপই পরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর আরো ছয়টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোতে তেল পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকাজ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়। দেশভাগের পরপরই আন্তর্জাতিক কম্পানিগুলোর সঙ্গে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকাজ চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করে পাকিস্তান সরকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকিউম অয়েল কম্পানি, পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, বার্মা অয়েল কম্পানি এবং পাকিস্তান শেল অয়েল কম্পানির মধ্যে বিভিন্ন চুক্তিপত্রের পর ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ব্যাপক অনুসন্ধানকাজ চালানো হয়। ১৬টি অনুসন্ধান কূপের মধ্যে সাতটিতেই ব্যাপক হারে গ্যাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় 'অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন' (ওজিডিসি)। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এই ওজিডিসিরই নাম হয় বাংলাদেশ তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। বাংলাদেশের তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের দায়িত্বে নিয়োজিত এ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের বিপরীতে ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারী। ষাটের দশকে যে দেশে প্রতি দু-তিনটি অনুসন্ধান কূপের মধ্যে একটিতে গ্যাস পাওয়ার সাফল্য রয়েছে, সেই দেশের মানুষ অত্যাধুনিক কাটিং এজ প্রযুক্তির এই যুগেও গ্যাসের অভাবে চরমভাবে আতঙ্কিত। ১৯৭২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৪২ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং জাতীয় চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহের জন্য কতগুলো অনুসন্ধান কূপ খনন করার প্রয়োজন ছিল আর কতগুলো খনন করা হয়েছে, সেই হিসাব পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষের কাছে আদৌ আছে কি না যথেষ্ট সন্দেহ। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে প্রতিবছর কয়টি কূপ খনন করা প্রয়োজন আর কয়টি করা হচ্ছে- এসব তথ্য জাতির কাছে অজানা। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য নিয়োজিত একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেঙ্কে ধ্বংস করে দিয়ে বিদেশি কম্পানিগুলোর হাতে দেশের সব গ্যাসক্ষেত্র তুলে দিয়ে পেট্রোবাংলা বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষায় সদা তৎপর। এ তো গেল তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কথা। কয়লা, কঠিন শিলাসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ইতিহাস আরো করুণ। ১৩ বার সংশোধন করার পরও আলোর মুখ দেখতে পারল না জাতীয় কয়লানীতি। ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কয়লাক্ষেত্র জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাখনি নিয়ে আজও কোনো আশানুরূপ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না। রংপুরের খালাশপীর কয়লাক্ষেত্র নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ী কয়লাক্ষেত্র দুটি নিয়ে বিদেশিদের টাকায় নানা রকম রঙিন নাটকের অভিনয় করছেন পেট্রোবাংলার কিছু নন-টেকনিক্যাল আমলা। পেট্রোবাংলার এত সব ব্যর্থতার মূল কারণ যোগ্য ও দক্ষ টেকনিক্যাল অফিসারদের দীর্ঘদিন ধরে পদবঞ্চিত করে রাখা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে চারটি জিএম (টেকনিক্যাল) পদ ফাঁকা থাকার পরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনেক যোগ্য অফিসারকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে মালয়েশিয়া পেট্রোনাস। অথচ পেট্রোবাংলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করতে পারেনি।