যুক্তরাজ্যের জাতীয় আর্কাইভে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একটি বিরল প্রাথমিক কপি খুঁজে পাওয়া গেছে। গত বছরের মে মাসে একজন স্বেচ্ছাসেবক পুরনো নথি তালিকাভুক্ত করার সময় এই ঐতিহাসিক দলিলটি খুঁজে পান। পরে গবেষকরা নিশ্চিত করেন, এটি ১৭৭৬ সালে ছাপানো স্বাধীনতার ঘোষণার বিরল ‘এক্সেটার মুদ্রণ’ সংস্করণের একটি আসল কপি।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের জাতীয় আর্কাইভ আনুষ্ঠানিকভাবে এই আবিষ্কারের কথা জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের ঠিক আগে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক দলিলটি খুঁজে পান মাইকেল স্কার। তিনি গত ১১ বছর ধরে জাতীয় আর্কাইভে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি পুরনো নথি পরীক্ষা করে তালিকাভুক্ত করেন, যাতে ভবিষ্যতে গবেষকদের কাজ সহজ হয়। অবসরপ্রাপ্ত এই বীমা কর্মকর্তা গত বছরের মে মাসে অষ্টাদশ শতকের রয়্যাল নৌবাহিনীর এক ক্যাপ্টেনের চিঠিপত্র ঘাঁটছিলেন। সেই সময় তিনি ১৭৭৬ সালের বড়দিনের আগের দিন আমেরিকার ‘ডালটন’ নামের একটি প্রাইভেটিয়ার জাহাজ দখলের একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে রাখা আরেকটি ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পান। কাগজটির ওপর শুধু লেখা ছিল, ‘আরেকটি কাগজ’। সাবধানে কাগজটি খুলতেই ওপরে বড় অক্ষরে লেখা দেখতে পান ‘ডিক্লারেশন’। মাইকেল স্কার বলেন, কাগজটি দেখে তার প্রথমেই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। পরে সেটিই সত্যি প্রমাণিত হয়।
গবেষকরা জানান, এই কপিটি মূল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাক্ষর হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ছাপা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটেনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে- এই খবর দ্রুত বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া। জাতীয় আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার ঘোষণার ‘এক্সেটার মুদ্রণ’ নামে পরিচিত এই সংস্করণের আসল কপির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টি টিকে আছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পাওয়া এটিই একমাত্র কপি। গবেষকদের মতে, এই সংস্করণটি ১৭৭৬ সালের ১৬ থেকে ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক্সেটার শহরে ছাপা হয়েছিল।
তবে এই দলিলের গুরুত্ব শুধু এর বিরলতা বা পুরনো হওয়ার কারণে নয়। জাতীয় আর্কাইভের গবেষক আমান্ডা বেভান বলেন, নথিটি এমন একটি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যা আমেরিকার নতুন গঠিত কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের অনুমতিতে চলছিল। সেই অনুমতিপত্রে কংগ্রেসের সভাপতি জন হ্যানককের স্বাক্ষর ছিল। তিনি বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের কথা ইতিহাসে অনেক বেশি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রে ব্রিটিশ বাণিজ্যে আঘাত করা এবং রয়্যাল নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা আমেরিকান নাবিকদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। বেভানের মতে, একটি যুদ্ধজাহাজে স্বাধীনতার ঘোষণার কপি পাওয়া যাওয়ায় বোঝা যায়, তখন এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলিল ছিল না। এটি যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। তার ধারণা, জাহাজের অধিনায়ক প্রথমে নিজের সরকারি নির্দেশনা নাবিকদের সামনে পড়ে শোনাতেন। এরপর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও পড়তেন, যাতে সবাই বুঝতে পারে তারা কী উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করছে। বেভান বলেন, এই দলিলটি সৈনিক ও নাবিকদের মনে করিয়ে দিত যে তারা শুধু কোনো ঘটনার প্রতিবাদে নয়, বরং স্বাধীনতা ও নতুন একটি রাষ্ট্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করছেন।
ডালটন ছিল ১৮টি কামানযুক্ত একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেটিয়ার জাহাজ। কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের অনুমতি নিয়ে এটি আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ১৭৭৬ সালের বড়দিনের আগের দিন ব্রিটিশ রয়্যাল নৌবাহিনীর ৬৪টি কামানযুক্ত এইচএমএস রিজনেবল জাহাজ সাত ঘণ্টা ধাওয়া করার পর পর্তুগালের উপকূলের কাছে ডালটনকে আটক করে। এরপর জাহাজটির ১২০ জন নাবিককে ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথে বন্দি করে রাখা হয়। তাদের একজন ছিলেন ১৯ বছর বয়সী চার্লস হেবার্ট। তিনি দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। পরে বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পান। কারাগারে থাকার সময় লেখা নিজের ডায়েরিতে তিনি ক্ষুধা, অসুস্থতা এবং কঠোর শাস্তির অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন। তবে সব কষ্টের পরও তিনি এবং আরো অনেক নাবিক শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরেছিলেন।
আরো পড়ুন
গোপন সূত্র প্রকাশে অস্বীকৃতি, মার্কিন সাংবাদিককে দৈনিক ৮০০ ডলার জরিমানা
এই আবিষ্কারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদরাও। ফিলাডেলফিয়ার মিউজিয়াম অব দ্য আমেরিকান রেভল্যুশনের সংগ্রহ ও প্রদর্শনী বিভাগের পরিচালক ম্যাথিউ স্কিক বলেন, এই কপিটি ডালটন জাহাজের অধিনায়কের সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ। তিনি বলেন, এটি শুধু একটি পুরনো কাগজ নয়। এটি এমন একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা বর্তমান প্রজন্মকে সরাসরি ১৭৭৬ সালের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। ম্যাথিউ স্কিকের মতে, এই আবিষ্কার আরো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। স্বাধীনতার যুদ্ধের ২৫০ বছর পরও সেই সময়ের ইতিহাস সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা রয়েছে। ভবিষ্যতেও এমন আরো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল বা তথ্য খুঁজে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।