ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শহর কর্তৃপক্ষ। হামলায় আহত হয়েছেন আরো অনেকে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণে ভবন কেঁপে ওঠে। বেশ কয়েকটি স্থানে আগুন ধরে যায় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো বলেন, হামলায় হতাহতের সংখ্যা 'উল্লেখযোগ্য'। তিনি জানান, রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল আবাসিক এলাকা, যেখানে সাধারণ মানুষ বসবাস করেন। বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ আবারও ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকায় হামলা চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। শহরের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। গত কয়েক ঘণ্টায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে বলে তিনি জানান।
হামলায় শহরের একাধিক জায়গায় আগুন লাগে। একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেখানে একজন গুরুতর আহত হন। প্রধান সড়কের পাশে একটি হোটেলেও আগুন ধরে যায়। দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। রাতভর আকাশে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার চেষ্টা চলতে থাকে। বিস্ফোরণের শব্দে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। হামলার পর সকালে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ, পুড়ে যাওয়া গাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখা যায়। কিছু জায়গায় বিস্ফোরণের কারণে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, মস্কো থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিভিন্ন রুশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় হামলার জবাবে তারা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেছে। এসব হামলার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেন, তার দেশ জ্বালানির সংকটে পড়েছে।তবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলহা স্টেফানিশিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, এটি ছিল কিয়েভবাসীর জন্য আরেকটি ভয়াবহ রাত। অনেক মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাতে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, শহরের বিভিন্ন জেলায় আগুন লাগে এবং আবাসিক ভবনসহ বেসামরিক স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর এটি ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রথম বড় আকারের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এর আগে রুশ গণমাধ্যম জানায়, রাশিয়া ইউক্রেনের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, মস্কো নতুন করে বড় হামলার পরিকল্পনা করছে। তিনি জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
নিরাপত্তাজনিত কারণে পোল্যান্ডও সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। দেশটি জানায়, এটি একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং আকাশসীমা নিরাপদ রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পোল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। ন্যাটো সামরিক জোটের আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী যেসব দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, তারা একে অপরকে এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে- যদি কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হয়, তাহলে সেটাকে পুরো ন্যাটো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
যুদ্ধের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার অগ্রগতি কিছু এলাকায় বেড়েছে। সম্প্রতি রুশ বাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর কোস্তিয়ানতিনিভকায় অগ্রসর হয়েছে। শহরটি ওই অঞ্চলে ইউক্রেনের হাতে থাকা শেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলোর একটি। মস্কো কোস্তিয়ানতিনিভকার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে পুরো দনবাস অঞ্চলে প্রবেশের পথ খুলে যাবে। এদিকে ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডাররা বলছেন, এ বছর তারা যতটা এলাকা হারিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি এলাকা পুনর্দখল করেছেন। এতে রুশ সীমান্ত থেকে দখল করা ক্রিমিয়া পর্যন্ত মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ রসদ সরবরাহের পথ ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের সামনের রেখায় বড় কোনো পরিবর্তন না হলেও দুই পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার বড় অংশ ২০২২ সালের আগ্রাসনের প্রথম দিকেই দখল করা করা হয়েছিল।






