মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর রন ডিসান্টিস খরার সময় এআই ডেটা সেন্টারগুলোকে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার থেকে নিষিদ্ধ করেন। একই সঙ্গে তিনি এমন নিয়ম চালু করেন, যাতে ডেটা সেন্টারের কারণে সেবা সংস্থাগুলো অতিরিক্ত দাম নিতে না পারে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পানির দরকার, তখন সেটি কিভাবে ডেটা সেন্টারে ব্যবহার হতে পারে।
এদিকে গত সপ্তাহে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের একটি কাউন্টিতে প্রস্তাবিত একটি ডেটা সেন্টার প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। প্রায় ৬০০ জন মানুষ সভায় অংশ নিয়ে প্রকল্পটি বাতিলের দাবি জানান। বাইরে আরো প্রায় ৩০০ জন ‘মানুষ আগে, মুনাফা নয়’ এবং ‘আমরা পানি চাই’ স্লোগান দেন। এখন সব জায়গায় একই ধরনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
ডেটা সেন্টারকে অনেকেই বিদ্যুৎ ও পানির অতিরিক্ত ব্যবহারকারী অবকাঠামো হিসেবে দেখছেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে খুব কম আপত্তি দেখা গেলেও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০টি হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই সেই সংখ্যা আরো বেড়ে গেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৭ জন আমেরিকান তাদের আশপাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণ দেখতে চান না। এই পরিস্থিতিতে একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যও উঠে এসেছে, মহাকাশে কোনো সিটি কাউন্সিল, জোনিং বোর্ড বা পানি কর্তৃপক্ষ নেই এবং সেখানে প্রতিবেশীদের অভিযোগও নেই।
এদিকে মহাকাশ ভিত্তিক এআই ডেটা সেন্টার আসছে। এখানে এমন ৭টি স্টক রয়েছে যা থেকে প্রচুর লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ঢেউ ডেটা সেন্টারগুলোকে বিদ্যুৎ গ্রিড এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সীমার কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। ফলে কম্পানিগুলো এখন কেবল দ্রুত কম্পিউটিং নিয়েই নয়, বরং পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়েও বেশি চিন্তিত হচ্ছে।
বৃহৎ আকারের এআই সিস্টেম চালানো ও প্রশিক্ষণ দিতে প্রচুর এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে এই চাহিদা অনেক দ্রুত বাড়ছে। এই কারণেই এখন কিছু বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষক মহাকাশে এআই কম্পিউটিং সিস্টেম বা ডেটা সেন্টার স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।
কক্ষপথে সূর্যের আলো প্রায় অবিরাম পাওয়া যায় এবং সেখানে শক্তির সরবরাহ অনেক বেশি স্থিতিশীল। পাশাপাশি পৃথিবীর মতো জমির সীমাবদ্ধতা, শীতলীকরণের জটিলতা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের চাপের মতো সমস্যাও সেখানে নেই। এই ধারণা অনুযায়ী, মহাকাশের ডেটা সেন্টারগুলো পৃথিবীর স্থলভাগের কেন্দ্রগুলোর বিকল্প হবে না। বরং ভবিষ্যতে যখন প্রযুক্তি ও অর্থনীতি আরো উন্নত হবে, তখন এটি বিশেষভাবে বেশি শক্তি-নির্ভর কম্পিউটিং কাজের জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনার সামনে এখনো বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন উৎক্ষেপণের উচ্চ খরচ, রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতা এবং মহাকাশে যন্ত্রপাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। তবুও এর মূল যুক্তি হলো, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমশ বিদ্যুৎনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে এর জন্য এমন স্থান খোঁজা হতে পারে যেখানে শক্তির সরবরাহ সবচেয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে এখন নতুন বড় বাধা হয়ে উঠছে সেমিকন্ডাক্টর নয়, বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ। এআই মডেলগুলো যত বড় ও জটিল হচ্ছে, ততই সেগুলো চালাতে ও প্রশিক্ষণ দিতে বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে বড় বড় ডেটা সেন্টার চালানো প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই চাপের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিড অনেক ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এতে কম্পানিগুলোকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, ভবিষ্যতের এআই অবকাঠামো কোথায় গড়ে তোলা হবে। এই পরিস্থিতিতে ‘মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার’ ধারণাটি আবার আলোচনায় এসেছে। ধারণাটি হলো, কক্ষপথে সূর্য থেকে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন শক্তি পাওয়া যায়, যা পৃথিবীর মতো বিদ্যুৎ সংকট, জমির অভাব বা স্থানীয় বিরোধিতার সমস্যাগুলো কমিয়ে দিতে পারে।
এই মডেলে ডেটা সেন্টারগুলো মহাকাশেই এআই-এর কাজ সম্পন্ন করবে এবং শুধু ফলাফল পৃথিবীতে পাঠাবে। টেসলা প্রধান ইলন মাস্কও বলেছেন, ভবিষ্যতে এআই বিকাশে চিপের চেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হতে পারে বিদ্যুৎ। তার মতে, নিরবচ্ছিন্ন সৌরশক্তি এবং প্রচলিত শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন না থাকায় কক্ষপথভিত্তিক কম্পিউটিং দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর স্থলভিত্তিক ডেটা সেন্টারের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এআই কম্পিউটিংয়ের সবচেয়ে কম খরচের উপায় হবে সৌরশক্তি চালিত এআই স্যাটেলাইট। তিনি আরো বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যবহার করে শত শত গিগাওয়াট থেকে ভবিষ্যতে এক টেরাওয়াট পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শক্তি দরকার এমন এআই সিস্টেম তৈরি করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন বা প্রায় অসম্ভব হবে।
এই মন্তব্যগুলো এআই শিল্পে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে শুধু উন্নত চিপই নয়, বরং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহও এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জেনসেন হুয়াং মনে করেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। তবে এআই কম্পিউটিংকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার ধারণা সম্পর্কে তিনি তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক। হুয়াং মহাকাশভিত্তিক এআই কম্পিউটিংকে একটি “স্বপ্ন” হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, বর্তমান প্রযুক্তি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আধুনিক এআই সার্ভার র্যাকগুলোতে কম্পিউটিং যন্ত্রাংশের পাশাপাশি শীতলীকরণ (কুলিং) ব্যবস্থারও বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ এআই অবকাঠামোর আকার যত বড় হয়, তাপ নিয়ন্ত্রণ বা থার্মাল ম্যানেজমেন্ট তত বেশি জটিল হয়ে ওঠে। তার মতে, এই প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মহাকাশে বড় আকারের এআই ডেটা সেন্টার স্থাপন করা সহজ হবে না।
এদিকে আইবিএম-এর সিইও অরবিন্দ কৃষ্ণ যুক্তি দিয়েছেন, এআই পরিকাঠামো খাতে ব্যয়ের বর্তমান গতিপথ অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নাও হতে পারে।প্রমাণিত এআই রাজস্বের চেয়ে এআই পরিকাঠামোতে ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। তার উদ্বেগ, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ গিগাওয়াট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, অবকাঠামোগত খরচ শেষ পর্যন্ত ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা ধরে নিচ্ছেন যে ভবিষ্যতের মুনাফা এই বিনিয়োগগুলোকে সার্থক প্রমাণ করবে। ব্যবসায়িক দিকটি এখনও অনিশ্চিত।
এর মানে এই নয় যে, এআই-এর চাহিদা ভুয়া, বরং এর অর্থ হলো পরিকাঠামো নির্মাণের তুলনায় অর্থায়ন পিছিয়ে থাকতে পারে। এই সেই ক্ষেত্র যেখানে আশাবাদী এবং সংশয়বাদী উভয়ই মূলত একমত। এই শিল্পের সীমাবদ্ধতা ক্রমশ চিপস (২০২৩ সালে) থেকে বিদ্যুতের (২০২৬ সালে) দিকে সরে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে ডেটা-সেন্টারের প্রসারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহই প্রধান সীমাবদ্ধতা হয়ে উঠতে পারে। গ্রিড আপগ্রেড, সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে।