যুক্তরাজ্য ও জাপান বহু বিলিয়ন পাউন্ডের একটি বিনিয়োগ চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই চুক্তির আওতায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো, আর্থিক খাত, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় 'নতুন এক যুগের' সূচনা করবে।
ডাউনিং স্ট্রিটের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো ও আর্থিক খাতে ৯ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি সমুদ্রের তীরে স্থাপিত বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে আরো প্রায় ৯ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশিও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকার বলছে, এই বিনিয়োগের ফলে আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যে কয়েক দশ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও শক্তিশালী হবে। লন্ডনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের সময় এই ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। পরে ডাউনিং স্ট্রিটে দুই নেতা জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে স্টারমার আলোচনাকে 'খুবই ফলপ্রসূ' বলে উল্লেখ করেন।
আরো পড়ুন
ট্রাম্পের জন্মদিনে পুতিন ও জেলেনস্কির ফোনালাপ, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা
তবে এই বিনিয়োগের পুরো অর্থ নতুন করে আসছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ডাউনিং স্ট্রিট বিনিয়োগের যে হিসাব প্রকাশ করেছে, তার একটি অংশ আগে থেকেই ঘোষিত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই চুক্তি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি নানারকম চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যদিও চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির অর্থনীতি ০.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল, তবুও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনার প্রভাব যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এই ধরনের বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব যুক্তরাজ্যের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়তে পারে।
তবে আইএমএফ মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর ইউরোপের জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। যদিও তখন প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে।
বৈঠকে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেছে। ইতালিকে সঙ্গে নিয়ে যে জিসিএপি (গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম) যুদ্ধবিমান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে উভয় দেশ আবারও নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। স্টারমার এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ব্রিটিশ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রোলস-রয়েস জাপানের অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির সঙ্গে যৌথভাবে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তিও হয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের গবেষণা, উদ্ভাবন ও সফটওয়্যার উন্নয়নের দক্ষতার সঙ্গে জাপানের শক্তিশালী উৎপাদন খাতকে যুক্ত করা হবে।
দোভাষীর মাধ্যমে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, যুক্তরাজ্য জাপানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার।
ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, মিতসুবিশি এস্টেট, মিতসুই ফুডোসান এবং নোমুরা রিয়েল এস্টেটসহ কয়েকটি বড় জাপানি প্রতিষ্ঠান আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো ও রিয়েল এস্টেট খাতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করবে।
এদিকে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। দলের ছায়া ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ বলেছেন, যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ নিয়ে আসে- এমন যেকোনো চুক্তিকে তারা সমর্থন করেন। তবে তিনি লেবার সরকারের সমালোচনা করে বলেন, কর বৃদ্ধি এবং নিয়োগদাতাদের জন্য অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তার দাবি, এর ফলে চাকরি কমছে এবং আরো বেশি মানুষ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
সব মিলিয়ে, জাপানের সঙ্গে নতুন এই বিনিয়োগ চুক্তিকে যুক্তরাজ্য সরকার অর্থনীতি চাঙ্গা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে এবং বিনিয়োগের কত অংশ নতুন অর্থ, তা আগামী দিনগুলোতে আরো পরিষ্কার হবে।