ত্রিভুজাকার নকশা, সামনের সরু অংশ, অলংকৃত স্তম্ভ আর জটিল কারুকাজে তৈরি নিউ ইয়র্ক সিটির সবচেয়ে পরিচিত স্থাপত্যগুলোর একটি ‘ফ্ল্যাটিরন বিল্ডিং’। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় এই নিদর্শনটি গত সাত বছর ধরে ঢেকে রাখা হয়েছিল ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ বা মাচা দিয়ে। অবশেষে সেই বন্দিদশার অবসান ঘটছে। পুরোনো সেই অফিস ভবনটি এখন রূপ নিচ্ছে নিউ ইয়র্কের অতি-বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে।
ভবনটির সবচেয়ে দামি অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লাখ পাউন্ড)। ম্যানহাটন মায়ামি রিয়েল এস্টেটের তথ্য অনুযায়ী, পুরো নিউ ইয়র্ক সিটিতে মাত্র ২১টি আবাসিক সম্পত্তির যার দাম এর চেয়ে বেশি!
আরো পড়ুন
‘ঘোস্ট রাইডার’ হয়ে মার্ভেলে যোগ দিচ্ছেন রায়ান গসলিং
১৯০২ সালে নির্মিত ২৪ তলা এবং ৯৪ মিটার (৩০৭ ফুট) উঁচু এই ভবনটি ছিল তৎকালীন স্থাপত্যবিদ্যার এক এক অনন্য বিস্ময়। স্টিল-ফ্রেমের ওপর নির্মিত শহরের শুরুর দিকের এই আকাশচুম্বী অট্টালিকাটি প্রথমে ‘বার্নহামস ফোলি’ নামে পরিচিত ছিল। কারণ স্থানীয়দের ভয় ছিল, অতিরিক্ত উচ্চতা ও সরু আকৃতির কারণে বাতাসের ধাক্কায় এটি হয়তো ভেঙে পড়বে। তবে সব আশঙ্কা দূর করে ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি টিকিয়ে রেখেছে নিজের ঐতিহ্য।
২০১৯ সালে সর্বশেষ অফিস ভাড়াটিয়া ‘ম্যাকমিলান পাবলিশিং’ ভবনটি ছেড়ে দিলে এটি খালি হয়ে পড়ে এবং মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতায় কয়েক বছর এভাবেই থাকে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ব্রডস্কি অর্গানাইজেশন, জিএফপি রিয়েল এস্টেট এবং সোরজেন্টে গ্রুপ নামক যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠান ভবনটিকে আল্ট্রা-লক্সারি কনডমিনিয়ামে রূপান্তরের কাজ শুরু করে।
পুরো সংস্কার কাজ শেষ হলে এতে মোট ৩৬টি খোলামেলা নকশার অ্যাপার্টমেন্ট থাকবে। তিন বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টগুলোর দাম শুরু হবে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে, আর বারান্দাসহ পাঁচ বেডরুমের পুরো ফ্লোরজুড়ে তৈরি ফ্ল্যাটের দাম পড়বে ৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। ভবনটির ভূগর্ভস্থ তলা ও সাধারণ পরিসরে থাকছে ৬০ ফুটের সুইমিং পুল, বিলিয়ার্ডস রুম, পিয়ানো লাউঞ্জ এবং ওয়েলনেস সেন্টার। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন বাসিন্দারা এখানে ওঠা শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে এবং ২০২৭ সালের শুরুতেই সব সুবিধাসহ এর কাজ শতভাগ সম্পন্ন হবে।
বিল্ডিংটির রূপান্তরের সময় উঠে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য ও ঐতিহাসিক উপাদান। সংস্কারকাজের সময় ২০ তলায় একটি গুপ্ত বারান্দার সন্ধান পান শ্রমিকরা, যা বহু বছর ধরে প্লাস্টারবোর্ডের পেছনে ঢাকা ছিল। এর পাশাপাশি ১৯১০ সালের কাঠের ঘূর্ণায়মান দরজার অবশিষ্টাংশ, পুরোনো সিঁড়ির লোহার গ্রিল এবং শতাব্দীর পুরোনো রেস্তোরাঁর মেন্যু, পিয়ানো, জুতো ও বিজ্ঞাপনের সন্ধান মিলেছে। এসব ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তু লবিতে কাচের পাত্রে প্রদর্শন করা হবে।
ভবনটির বাইরের দিকে জটিল টেরাকোটার হাজার হাজার টুকরো পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার এক বিশেষ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি টুকরো হাত দিয়ে নিখুঁতভাবে যথাস্থানে বসানো হয়েছে। সেই সঙ্গে এক হাজারটিরও বেশি পুরোনো জানালা পরিবর্তন করে পুরু কাচের সাউন্ডপ্রুফ নতুন জানালা লাগানো হয়েছে।
চলতি গ্রীষ্মের শেষেই ভবনটির চারপাশের মাচা বা স্ক্যাফোল্ডিং পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হবে। সাত বছর পর প্রথমবার যখন এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যটির নতুন আলোয় উদ্ভাসিত রূপ উন্মোচিত হবে, তখন নিউ ইয়র্কবাসী ও বিশ্ব পর্যটকরা এক নতুন ও রাজকীয় ‘ফ্ল্যাটিরন’-কে দেখতে পাবেন।