ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে সোমবার ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অধিকাংশ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ভবন ধসে পড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ছিল সমুদ্রের নিচে, যার ফলে আশপাশের উপকূলে প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট) উচ্চতার সুনামি ঢেউ দেখা যায়। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুনামির আশঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে বলে জানিয়েছে প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার।
ফিলিপাইন ইনস্টিটিউট অব ভলকানোলজি অ্যান্ড সিসমোলজির পরিচালক টেরেসিটো বাকোলকল জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পাওয়া ভিডিওগুলোতে একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সুনামির কারণে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান চলছে।
ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে এ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। দেশটির ভূমিকম্প সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.৮ এবং এটি সমুদ্রের নিচে ৩৩ কিলোমিটার গভীরে উৎপন্ন হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল সারাঙ্গানি প্রদেশের মায়াসিম শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
ক্ষয়ক্ষতি
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী জেনারেল সান্তোস, যেখানে ৭ লাখেরও বেশি মানুষ বসবাস করে এবং যা টুনা রপ্তানি ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভূমিকম্পের পর একাধিক আফটারশক অনুভূত হয় এবং এটি মালয়েশিয়াতেও অনুভূত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উপকূলে ছোট আকারের সুনামি ঢেউও রেকর্ড করা হয়েছে।
বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক রড সস্মেনা এপিকে জানিয়েছেন, ফিলিপাইনের জেনারেল সান্তোসে ভূমিকম্পে অন্তত ৭ জন নিহত এবং প্রায় ১৩০ জন আহত হয়েছেন। সেখানে কয়েকটি ছোট ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়েছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনায় বিপজ্জনক ফাটল দেখা দিয়েছে। তিনি এবং আরেক কর্মকর্তা এডনার দায়াংহিরাং জানান, দক্ষিণাঞ্চলের দক্ষিণ কোটাবাটো ও দাভাও অক্সিডেন্টাল প্রদেশ এবং বালুত দ্বীপে আরো ৫ জন নিহত হয়েছেন।
সস্মেনা বলেন, জেনারেল সান্তোসে ধসে পড়া একটি দোতলা স্কুলে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটকা পড়তে পারে বলে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করছে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেননি। তবে জাতীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
সোমবার গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে ফিলিপাইনের সব সরকারি স্কুল খুলে দেওয়া হয়। কর্মকর্তা এডনার দায়াংহিরাং জানান, সকালে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত এবং কিছু শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
জেনারেল সান্তোসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ১৭টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
আঞ্চলিক পরিচালক রড সস্মেনা বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি গাড়িতে ছিলেন। তিনি জানান, ‘আমার পিকআপ হঠাৎ কেঁপে ওঠে, আমি ভেবেছিলাম টায়ার পাংচার হয়েছে। মানুষ ঘর থেকে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে।’
দাভাও শহরে অবস্থানরত আরেক কর্মকর্তা এডনার দায়াংহিরাং বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি ভারসাম্য রাখতে পারছিলেন না। তিনি জানান, ‘মাটি কাঁপতে থাকায় আমি ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিলাম না।’ এদিকে ম্যানিলার একটি রেডিও জানিয়েছে, তাদের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় থাকা চারতলা বাণিজ্যিক ভবনের আংশিক অংশ ধসে পড়েছে। তবে কর্মীরা দ্রুত নিচে নেমে আসায় কেউ আহত হননি। এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি ধ্বংসস্তূপে কেউ আটকে আছেন কি না। ভূমিকম্পের কারণে ভবন থেকে ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে পার্ক করা ট্রাইসাইকেল ট্যাক্সিগুলোর ক্ষতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রায় ৩ ফুট উচ্চতার সুনামি ঢেউ
ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট) উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সুলতান কুদারাত ও সারাঙ্গানি প্রদেশে এই ঢেউ পর্যবেক্ষণ করা হয়। মালয়েশিয়ার আবহাওয়া দপ্তর বর্নিও দ্বীপের সাবাহ রাজ্যে সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। সাবাহ দক্ষিণ ফিলিপাইনের কাছাকাছি অবস্থিত। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের কাছে ৮৩ সেন্টিমিটার (২.৭ ফুট) উচ্চতার ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ৫৫ কিলোমিটার। বিভিন্ন সংস্থার প্রাথমিক পর্যায়ের পরিমাপে এমন পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক বলে জানিয়েছে তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিপাইন বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের `রিং অব ফায়ার'-এ অবস্থিত হওয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখোমুখি হয়। এছাড়া দেশটিতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০টি টাইফুন ও ঝড় আঘাত হানে।






