আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে পরিচালিত ঐতিহাসিক দাস বাণিজ্য থেকে লাভবান দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। ঘানায় অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষে এই দাবি জানানো হয়।
সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল দাসপ্রথা ও দাস বাণিজ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরণভিত্তিক ন্যায়বিচারের দাবি আরো জোরালো করা। এর আগে গত মার্চ মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওই প্রস্তাবে আটলান্টিক দাস বাণিজ্যকে 'মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোকে একটি আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ তহবিলে অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চদশ থেকে উনিশ শতকের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ আফ্রিকান নারী, পুরুষ ও শিশুকে জোর করে ধরে নিয়ে আমেরিকায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তাদের দাস হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এই দাস শ্রমের ওপর ভিত্তি করেই বহু দেশ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিপুল সম্পদ অর্জন করে।
ঘানার রাজধানী আক্রায় অনুষ্ঠিত 'নেক্সট স্টেপস' সম্মেলনে ১৯ দফার একটি ক্ষতিপূরণ পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। পরিকল্পনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ব্যাপক ঋণ মওকুফের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া দাস বাণিজ্যের সময় লুট হয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পরিকল্পনায় একটি বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে। তবে এই তহবিলে কত অর্থ থাকবে বা কোন দেশ কত অর্থ দেবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতারা বলেন, দাসপ্রথার প্রভাব সবার ওপর সমান ছিল না। বিশেষ করে আফ্রিকান নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তাই ক্ষতিপূরণ পরিকল্পনায় তাদের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সম্মেলনের নেতারা দাস বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত দেশগুলোর প্রতি 'পূর্ণ, আনুষ্ঠানিক এবং নিঃশর্ত ক্ষমা' চাওয়ার আহ্বান জানান।
ঘানার প্রেসিডেন্ট জন দ্রামানি মাহামা সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, 'ইতিহাস আমাদের অপরাধবোধ বহন করতে বলে না, কিন্তু দায়িত্ব নিতে বলে।'
সম্মেলনে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। তিনি বলেন, দাস বানানো মানুষদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তাদের পণ্যের মতো কেনাবেচা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণকে শুধু অর্থ প্রদানের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। তার মতে, একটি চেক লিখে দিয়েই এই ইতিহাসের দায় শেষ হয়ে যায় না।
মার্চ মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে ভোট হয়। সেখানে ১২৩টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনা আটলান্টিক দাস বাণিজ্যকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিপক্ষে ভোট দেয়। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশসহ মোট ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কোনো প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কোনো দেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা যাবে না।
যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই দাসপ্রথার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দেশটির অবস্থান হলো, অতীতে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের জন্য বর্তমান প্রজন্ম বা বর্তমান প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না। এ বিষয়ে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত জেমস কারিউকি বলেন, কোনো একটি ঐতিহাসিক নৃশংসতাকে অন্যটির চেয়ে বেশি বা কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। একই ধরনের অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্রও। জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যে ঘটনাগুলো সংঘটিত হওয়ার সময় বেআইনি হিসেবে বিবেচিত ছিল না, সেসব ঘটনার জন্য বর্তমানে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কোনো আইনগত ভিত্তি রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না। তিনি আরো বলেন, জাতিসংঘের প্রস্তাবে 'ক্ষতিপূরণভিত্তিক ন্যায়বিচার' কারা পাবে, সেটিও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশই দাস বানানো আফ্রিকানদের বংশধর বা ক্ষতিগ্রস্ত আফ্রিকান, ক্যারিবীয় ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়নি। তবে ইতিহাস বলছে, উনিশ শতকে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল দাস মালিকদের। যাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যও রয়েছে। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৮৩০-এর দশকে দেশটি দাস মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়। বর্তমান মূল্যে সেই অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বেশি, যা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি পাউন্ডের সমান।




