ফ্রান্সের বার্ষিক সংগীত উৎসব ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’-এ বছর রাতভর সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, সিরিঞ্জ হামলার অভিযোগ এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলার ঘটনায় আলোচনায় এসেছে। দেশজুড়ে আয়োজিত এই উৎসবে দুই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে সিরিঞ্জ দিয়ে খোঁচা দেওয়ার ঘটনাও তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত এই জনপ্রিয় পথসংগীত উৎসবে লাখো মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকও ছিলেন। তবে উৎসব চলাকালে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটায় আনন্দের পরিবেশ দ্রুত অস্থির হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা দেখা যায় রাজধানী প্যারিসে। রাতভর বিভিন্ন এলাকায় মারামারি, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে পুলিশ ব্যাপক অভিযান চালায়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়ে অন্তত ২৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ প্যারিস থেকে আটক করা হয়েছে।
উৎসব ঘিরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ছিল সিরিঞ্জ দিয়ে খোঁচা দেওয়ার অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ভিড়ের মধ্যে থাকা অবস্থায় কয়েকজন নারী হঠাৎ শরীরে সিরিঞ্জের খোঁচা অনুভব করেন। এক নারীকে প্যারিসের বুলভার দ্য লা মাদেলেন এলাকায় সিরিঞ্জ দিয়ে খোঁচা দেওয়ার পর অচেতন হয়ে পড়তে দেখা যায়। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা তার শারীরিক পরীক্ষা করেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই সিরিঞ্জের মাধ্যমে কোনো মাদক বা অন্য কোনো পদার্থ শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য ফরেনসিক পরীক্ষাও চলছে।
এদিকে উৎসব চলাকালে যৌন নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অন্তত দুই নারী ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া আরো কিছু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে। কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে কম বয়সীরাও থাকতে পারেন। তবে তদন্তের স্বার্থে কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। শুধু যৌন নির্যাতন নয়, বিভিন্ন এলাকায় ছুরিকাঘাত এবং দলবদ্ধ সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকা শাতলে সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। সেখানে রাস্তায় মারামারি, আতঙ্ক এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সরু রাস্তাগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদে এলাকা ত্যাগ করতে পারেননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স ও জরুরি সেবাকর্মীদের হস্তক্ষেপ করতে হয়।
স্টিভ নামে এক ব্রিটিশ প্রত্যক্ষদর্শী ডেইলি মেইলকে বলেন, উৎসবের পরিবেশ ছিল ‘অত্যন্ত জনাকীর্ণ এবং বিপজ্জনক’। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করে বিভিন্ন স্থানে মারামারি ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক তৈরি হয় এবং মানুষের চাপে দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়। দেশজুড়ে হাজারো পুলিশ সদস্য, অগ্নিনির্বাপণকর্মী এবং জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া নজরদারির জন্য ড্রোন ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়। যদিও সরকার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে যথাযথ বলে দাবি করেছে, তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় জনসমাগমের আগে আরো শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেত কি না। বিশেষ করে অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বড় ধরনের ভিড়ের ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও কেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে যৌন নির্যাতন, সিরিঞ্জ হামলা, ছুরিকাঘাত এবং সহিংসতার অন্যান্য অভিযোগের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। কর্তৃপক্ষ বলছে, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।




