অধিকৃত পশ্চিম তীরের অন্যতম বৃহত্তম ও ঐতিহাসিক শহর হেবরনে ৭ মাস বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশুকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা। নিহত শিশু সাম আবু হাইকালের পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী সেনার শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সরাসরি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন বলছে, গত ৫ জুন বাবা ফাহদ আবু হাইকাল তার পরিবারকে নিয়ে হেবরনের একটি সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় সামনে ইসরায়েলি সেনাদের একটি দল দেখতে পান। তিনি গাড়ির গতি কমিয়ে থামানোর চেষ্টা করলে এক সেনা সদস্য রাইফেল তাক করে গুলি চালায় বলে পরিবারের দাবি।
একটি গুলি গাড়ির সামনের অংশে আঘাত করলেও আরেকটি গুলি উইন্ডশিল্ড ভেদ করে স্টিয়ারিং হুইল স্পর্শ করে ফাহাদের হাতে লাগে এবং পরে তার ৭ মাস বয়সী ছেলে সামের মাথায় আঘাত হানে। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে তার মৃত্যু হয় বলে জানায় চিকিৎসকরা।
ভিন্ন চিত্র
ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করে, সেনারা একটি গাড়িকে নিজেদের দিকে দ্রুতগতিতে আসতে দেখেছিল এবং সে কারণেই একজন সেনা সদস্য গুলি চালিয়েছিল।
তবে মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেমের সংগ্রহ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়িটি সেনাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছিল। পরিবারের সদস্যরা এবং ভিডিও ধারণকারী প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, গাড়ি থামার মুহূর্তেই গুলি ছোড়া হয়।
ফাহদের মা ফেরিয়াল আবু হাইকাল বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম তারা আমাদের ফিরে যেতে বলবে বা সতর্ক করতে আকাশে গুলি করবে। কিন্তু তারা কোনো সতর্কতা ছাড়াই গুলি চালায়।’
ভিডিওতে আরো দেখা যায়, গুলি করার পর সেনাটি ঘটনাস্থল থেকে হেঁটে সরে যায়। পরিবারের দাবি, সেখানে উপস্থিত কোনো সেনা আহত শিশু বা তার মাকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেনি।
তদন্ত শুরুর আশ্বাসেও আস্থাহীন পরিবার
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘটনার পর সেনারা এলাকায় ফিরে এসে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করে নিয়ে যায়।
ফাহদ আবু হাইকাল তদন্তে সহযোগিতা করছেন। তবে তার বিশ্বাস, গুলিটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ছোড়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন সামনে কাউকে দেখেন, তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন, তখন সেটিকে ভুল বলা যায় না। ওই সেনা সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি করেছে।’
শোক আর ক্ষোভে পরিবার
সামের মা দানিয়া আবু হাইকাল এখনো শারীরিক ও মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যে গুলিতে তার ছেলে নিহত হয়, তার একটি অংশ দানিয়ার মুখেও আঘাত করে। এছাড়া শরীরে এখনও ধাতব টুকরো রয়ে গেছে, যা হৃদযন্ত্রের খুব কাছে থাকায় চিকিৎসকেরা অপসারণের ঝুঁকি নিতে চাননি।
একমাত্র সন্তানকে হারানোর বেদনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বুকের দুধ খাওয়াতাম। এখন বুকের দুধ জমে ব্যথা করছে। প্রতিবার দুধ বের করার যন্ত্র ব্যবহার করলে আমি কেঁদে ফেলি।’
সামের নানা নিদাল সালামেহ বলেন, তার ৭ নাতি-নাতনির মধ্যে সাম ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই নিষ্পাপ ৭ মাসের শিশুটি তাদের কী ক্ষতি করেছিল?’
বাবার আর্তনাদ ও ভীতি
ছেলের মৃত্যুর কয়েক দিন পরও দানিয়া শুধু শোকে নয়, ক্ষোভেও ভুগছেন। তার অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনারা খুব কম ক্ষেত্রেই জবাবদিহির মুখোমুখি হয়।
তিনি বলেন, ‘যে সেনা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে, সে যেন আমার এই কষ্ট অনুভব করতে পারে। তাকে শাস্তি পেতেই হবে। সে যেন পার পেয়ে না যায়।’
মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে অন্তত ২৩৬ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। চলতি বছর নিহত শিশুদের মধ্যে সাম আবু হাইকাল ছিলেন ১৩তম।