সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ভোটারদের প্রায় ৫৫ শতাংশ এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৫ শতাংশ। মোট ভোটারদের প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
বিতর্কিত এই প্রস্তাবটি দিয়েছিল ডানপন্থী সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি)। দলটি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন কমানোর পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তাদের দাবি ছিল, দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। তাই জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমিত রাখা প্রয়োজন। তবে ভোটারদের বড় একটি অংশ এই যুক্তি গ্রহণ করেননি। ফলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।
ফলাফল ঘোষণার পর সন্তোষ প্রকাশ করেন সুইজারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী বিট ইয়ান্স। তিনি বলেন, এই ভোটের ফল দেশ ও বিদেশে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তার ভাষায়, এটি স্থিতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং নির্ভরযোগ্যতার বার্তা। এই গণভোটকে শুধু জনসংখ্যা বা অভিবাসন ইস্যু হিসেবে দেখা হয়নি। অনেকের মতে, এটি ছিল ইউরোপের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ প্রস্তাবটি পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের অবাধ যাতায়াত চুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। এতে ইউরোপীয় বাজারে দেশটির প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আর তাই সুইস সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং দেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দল এই কারণেই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছিল।
আরো পড়ুন
যুক্তরাজ্যে ১৮ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করবে জাপান
বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ। ২০০২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ। গত দুই দশকে দেশটিতে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। সুইস পিপলস পার্টির দাবি ছিল, নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের কারণে বাসস্থানের সংকট, যানজট, স্কুলে অতিরিক্ত চাপ এবং সামাজিক সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। দলটির নেতারা বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে না আনলে এসব সমস্যা আরো বাড়বে।
তবে প্রস্তাবের বিরোধীরা বলেন, দেশের নানা সমস্যার জন্য শুধু অভিবাসনকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের মতে, আবাসন সংকট, স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত সমস্যার পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বার্ন সিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের রাজনীতিবিদ হেলিন জেনিস বলেন, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্য বীমার খরচ বা সরকারি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অভিবাসীরা নেন না। তাই সব সমস্যার জন্য তাদের দায়ী করা সঠিক নয়।
অন্যদিকে সুইস পিপলস পার্টির রাজনীতিক নিলস ফিখটার দাবি করেন, অভিবাসনের কারণেই দেশের ওপর চাপ বেড়েছে। তার মতে, বাসস্থান সংকট, যানজট এবং সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ভোটের ফলাফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। বড় শহরগুলোতে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে বেশি ভোট পড়েছে। রাজধানী বার্নে প্রায় ৮৪ শতাংশ ভোটার জনসংখ্যা সীমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। পর্যটননির্ভর এলাকাগুলোতেও প্রস্তাবটি তেমন সমর্থন পায়নি। কারণ এসব অঞ্চলের হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটন খাত বিদেশি শ্রমিকদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। সেন্ট মোরিৎসের আবাসস্থল গ্রাউবুন্ডেন এবং জারমাট ও ম্যাটারহর্ন পর্বতের জন্য পরিচিত ভালাইস ক্যান্টনের ভোটাররাও প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই ফলাফল দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। সুইজারল্যান্ডের অর্ধেকেরও বেশি রপ্তানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে যায়। ফলে ইউরোপের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী সংগঠন ইকোনোমিসুইসের প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিন্স বলেন, প্রস্তাবটি পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে যেতে পারত। তার মতে, সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাই তাদের সঙ্গে স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। নিয়োগদাতারাও প্রস্তাবটি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ সুইজারল্যান্ডের অনেক খাত বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির হোটেল শিল্পে কর্মরত মানুষের প্রায় অর্ধেকই অভিবাসী। হাসপাতাল, নার্সিং সেবা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বিদেশি কর্মীদের ভূমিকা বড়।
প্রস্তাবের বিরোধীরা আরো বলেন, সুইজারল্যান্ডে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। এই বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিত করতে এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে তরুণ কর্মীর প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় শ্রমবাজার একা সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এদিকে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন ভোটের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও শক্তিশালী অংশীদারত্ব রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটের ফল শুধু জনসংখ্যা সীমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং এটিও দেখিয়েছে যে অনেক সুইস নাগরিক দেশের সব সমস্যার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করার রাজনীতিতে আর আগের মতো আস্থা রাখছেন না। সুইজারল্যান্ডে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশটির বড় নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই গণভোটের মাধ্যমে নেওয়া হয়। কোনো বিষয়ে জাতীয় ভোট আয়োজনের জন্য মাত্র এক লাখ নাগরিকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেই উদ্যোগ নেওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, এই গণভোটে জনসংখ্যা সীমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সরকার, ব্যবসায়ী মহল এবং ইউরোপপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো স্বস্তি প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ফলাফলটি সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অবস্থানকে আরো একবার স্পষ্ট করে তুলেছে।