বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নামে একটি দল গঠন করে, সাধারণে যা জাতীয় নাগরিক পার্টি হিসেবে পরিচিত। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৬টি আসন লাভ করে এনসিপি। আসন সংখ্যা যাই হোক, এনসিপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিচিত নাম। কিন্তু ভারতেও যে এনসিপি নামে একটি দল আছে, রবিবার সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষই সেটা জানতেন না। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ সদস্যের এক যোগে এনসিপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণায় ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন ঝড় উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তছনছ হয়ে গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতর-বাহির। এক যোগে তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ সংসদ সদস্যের এনসিপিতে যোগ দেওয়ার ঘটনা সেই টালমাটাল পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করলো।
এমপিদের কেনাবেচা বন্ধে জাতীয় সংসদে দলবদল বা ফ্লোর ক্রসিং ঠেকাতে বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া আছে। ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো ব্যক্তি দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদে তার আসন শূন্য হয়ে যায়। সরকার স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে ভারতের সংবিধানের দশম তফশিলেও বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের মতো দলত্যাগ বিরোধী আইন রয়েছে। বাংলাদেশের মতো ভারতেও কেউ দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তার সদস্যপদ খারিজ হয়ে যায়।
তবে এই আইনেরও একটি ফাঁক আছে, কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য যৌথ সিদ্ধান্তে চাইলে অন্য কোনো দলের সঙ্গে একীভূত হতে পারে। ছোট্ট ফাঁক গলে লখিন্দরের বাসর ঘরে যেমন সাপ ঢুকেছিল। আইনের এই ফাঁক গলে কাকলী ঘোষ দস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় আর পার্থ ভৌমিকরা এখন তৃণমূলের মূল ধরেই টান দিয়েছেন। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য সংখ্যা ২৮। দুই-তৃতীয়াংশ মানে ১৯ জন হলেই তারা অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হতে পারতেন। সেখানে তাদের দলে একজন বেশিই আছে।
কাগজে-কলমে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া-এনসিপিআই’তে যোগ দিলেও তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের মূল লক্ষ্য ক্ষমতা। কেন্দ্রে না হলেও এতদিন তবু রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল। গত নির্বাচনে ভরাডুবির পর কাকলী ঘোষদের মনে হলো, ‘ক্ষমতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’। কিছুটা আইনি ঝুঁকি থাকলেও তারা সরাসরি বিজেপিতেই যোগ দিতে পারতেন। বিজেপিতে না গিয়ে এনসিপিআইতে কেন, এটা নিয়েই সবার কৌতুহল। এখানেই লুকিয়ে আছে রাজনীতির কূটচাল আর কূটকৌশলের খেলা। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ আর বিজেপি মিলেই যে এনসিপিআই আবিষ্কার করেছে, তা এখন একেবারে সংবিধান না বোঝা ভারতের শিশুটিও বোঝে।
সরাসরি বিজেপিতে না গেলেও তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা এনসিপিআই নিয়ে বিজেপির পাশেই মানে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোটেই থাকার ঘোষণা দিয়েছে। সরাসরি যোগ দিলে তারা আসলে বিজেপির সর্বভারতীয় বিশাল সমূদ্রে বিলীন হয়ে যেতো। আলাদা কোনো অস্তিত্বই থাকতো না। তাই তারা এনসিপিআইয়ের সাথে তৃণমূলকে একীভূত করেছে। দুই-তৃতীয়াংশের যৌথ সিদ্ধান্তে অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সুযোগ আছে। তবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে মূল রাজনৈতিক দল ও সংসদীয় দলকে আলাদা সত্ত্বা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হতে হলে মূল দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগবে। মমতা-অভিষেক নিশ্চয়ই দল ভাঙ্গার অনুমতি দেবেন না। তাই বিজেপিতে যোগ দিলে সেটা নিছক দলবদল হিসেবেই চিহ্নিত হতো, একীভুত হওয়া নয়। অভিষেক বন্দোপাধ্যায় এরই মধ্যে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে দেওয়া চিঠিতে এ কথা বলেছেন। তবে এনসিপিআইতে যাওয়ার একটা বড় সুবিধাও আছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হলেও এনসিপিআইতে কোনো মাতব্বর নেই। এনসিপি মূলত ত্রিপুরাভিত্তিক একটি পারিবারিক দল। একসময় শিউলি কুন্ডু দলটির প্রধান ছিলেন, এখন তার স্বামী উত্তীয় কুন্ডু দল চালান। দল ভাড়া দিতে পেরেই নিশ্চয়ই তারা খুশি থাকবেন। তাই কাকলী ঘোষরা এখানে নিজেদের মতো ছড়ি ঘোড়াতে পারবেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, এমনকি নিজেদের আসল তৃণমূল দাবি করতে পারবেন। গত নির্বাচনে ত্রিপুরার দুটি আসনে নির্বাচন করে যে দল সাকুল্যে ভোট পেয়েছে ৮৮২, তারাই এখন এনডিএ জোটে বিজেপির পর সবচেয়ে বড় দল। ৮৭০ জন অনুসারীর ফেসবুক পেজ আর হাওড়ায় জনমানবহীন ভুতুড়ে অফিস ছাড়া যাদের কিছু ছিল না, তারা এখন লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় দল। আসলেই রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই!
এনসিপিআই কাকলী ঘোষদের ডেসটিনেশন নয়, ট্রানজিট মাত্র। তাদের আসল লক্ষ্য তৃণমূল দখল নেওয়া। সরাসরি বিজেপিতে গেলে সে সুযোগ আর থাকতো না। একীভূত হওয়ার পর তারা এখন নিজেদের আসল তৃণমূল হিসেবে দাবি করবে এবং তৃণমূলের নির্বাচনী প্রতীক ’জোড়া ফুল’ কেড়ে নিতে চাইবে, দখল নিতে চাইবে তৃণমূলের অফিসের। মাথার ওপর বিজেপির হাত থাকলে আসলে কিছুই অসম্ভব নয়।
সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাদের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হতো। তারা চিহ্নিত হতো ক্ষমতালোভী, বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। যাতে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটতে পারতো। আর এত বড় ডিগবাজি দেওয়ার মতো সক্ষমতাও প্রবীণ নেতাদের অনেকের নেই। তারচেয়ে বড় কথা, তাদের লক্ষ্য তো অনেক দূরে। তাই লম্বা ডিগবাজি দিয়ে হাত পা ভেঙ্গে এখনই রাজনীতিতে ইতি ঘটানোর ঝুঁকি তারা নিতে চাননি। তাছাড়া এতদিন অসাম্প্রদায়িকতা আর বাঙালিয়ানার গল্প বলে এখন সরাসরি বিজেপির কোলে চড়ে বসলে তাদের নৈতিকতা প্রশ্নের মুখে পড়তো। তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন এখনও উঠছে। তবে চক্ষুলজ্জাটা অন্তত আছে। আর এই চক্ষুলজ্জার খাতিরেই তারা ত্রিপুরাভিত্তিক বাঙালিদের দল এনসিপিআইকে আবিষ্কার করেছে। এখন তারা বলতে পারবেন, আমরা মমতাকে ছেড়েছি, কিন্তু বিজেপিতে তো যাইনি।
তাছাড়া তৃণমূলের ঘর ভাঙ্গার পাশাপাশি বিজেপিকে নিজেদের ঘরের দিকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে। একসঙ্গে তৃণমূলের ২০ জন হেভিওয়েট নেতার যোগ দেওয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি শিবিরের ভেতরেই তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ ছিল। নতুন নেতারা এলে পুরোনো ও ত্যাগী নেতাদের পদপদবী, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ভাগ বসতো। তারচেয়ে দূরে থেকে কাছে থাকাই ভালো। সাপ মরে ভুত, কিন্তু লাঠির কিচ্ছু হয়নি।
এনসিপিআইয়ের আবিষ্কার করে কাকলী ঘোষরা এক ঢিলে অনেক পাখি মারলেন। নিজেদের সদস্যপদের আইনি সুরক্ষা পেলেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে তছনছ করার সুযোগ নিলেন, ভবিষ্যতের রাজনীতির পথ সুগম রাখলেন আর এনডিএ জোটের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ক্ষমতার কাছাকাছিই রইলেন।
এনসিপিআই এতদিন নিজেদের ‘সমাজসেবামূলক দল’ হিসেবে দাবি করতো। সংগঠনের পুরোনো এক বিবৃতিতে লেখা, ‘দল বদলানো রাজনৈতিক মুখ নয়; আপনি এগিয়ে আসুন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে’। এখন কোথায় মুখ লুকাবে এনসিপিআই। বিজেপির প্রযোজনায় কাকলী ঘোষ আর সুদীপ বন্দোপাধ্যায়রা সংবিধানকে যেভাবে পাশার বোর্ড বানালেন, রাজনীতিকে বানালেন ছেলেখেলায়; তার শেষ কোথায়? পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগেও অনেক চালাকি করেছে বিজেপি। এবার চালাকিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে মনে হয়। এখন অতি চালাকের গলায় দড়ি পড়বে না মমতা-অভিষেককে একেবারে হটিয়ে শুভেন্দু-সুদীপরাই পশ্চিমবঙ্গে রাজ করবেন; তা দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে।






