ইরানকে নিয়ে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবারও তিনি দেশটির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্য দেন। এমন পরিস্থিতিতে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত সপ্তাহে উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছায়। বর্তমানে সেই চুক্তির পরবর্তী ধাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে লেবানন পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালি, ইরানের জব্দ করা সম্পদ এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান ও কাতার। আলোচনার একদিন আগে ইরান ঘোষণা দেয় যে তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে। ইরানের দাবি, লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহের অন্তর্বর্তী চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত বন্ধ করা। এর মধ্যে লেবাননের পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ইরান বলছে, অন্য কোনো বিষয়ে অগ্রগতির আগে লেবাননের সংকটের সমাধান করতে হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের পক্ষ থেকে শুল্ক আরোপ করবে। আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের কয়েকশ কোটি ডলারের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা। একই সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। আলোচনার সঙ্গে জড়িত যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানিয়েছেন, আলোচকরা প্রয়োজনে সারা রাত বৈঠক চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য এলেও ইরানের প্রতিনিধিরা আলোচনা থেকে সরে যাননি এবং সংলাপ চালিয়ে গেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ে দেওয়া বক্তব্যগুলোর প্রকৃত অর্থ বুঝতে এবং সেগুলো স্পষ্ট করতেই আলোচনার বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে। তিনি আরো জানান, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা এবং দক্ষিণ লেবাননে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে। রবিবার তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। কারণ বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮১ দশমিক ৭০ ডলারে ওঠে। ইরানের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা দেশটির গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রবিবারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে লেবানন ইস্যু। তবে এর পাশাপাশি ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং দেশটির তেল রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত 'ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কম্পানি'-এর প্রধান নির্বাহী হামিদ বোভার্দ বলেন, আলোচনায় তেল খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাড়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে এ তথ্য জানান।
এদিকে আন্তর্জাতিক আলোচনা চলার মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে দেশটির ফুটবল দল। বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র এবং গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিছু ইরানি গণমাধ্যমে এমন ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে প্রতীকীভাবে বেইরানভান্দকে হরমুজ প্রণালি আটকে রাখতে দেখা যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া কালিবাফও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বেইরানভান্দের একটি সেভের ছবি পোস্ট করেন। ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, 'আমরা এভাবেই আমাদের ভূমিকে রক্ষা করি।'
অন্যদিকে জেরুজালেমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের লক্ষ্য এখনো শেষ হয়নি। জেএনএস আন্তর্জাতিক নীতি সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, চলমান সামরিক চাপের ফলে শেষ পর্যন্ত ইরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। নেতানিয়াহুর মতে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৃত বিজয় তখনই আসবে, যখন ইরানের জনগণ নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সরিয়ে দেবে।
এদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল-শারা জানিয়েছেন, লেবাননে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার কোনো পরিকল্পনা সিরিয়ার নেই। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় সিরিয়া ভূমিকা রাখতে পারে। রবিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আল মাশহাদ নেটওয়ার্ককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল-শারা বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তার দাবি, ট্রাম্প শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সিরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকার কথা বলেছেন, সামরিক হস্তক্ষেপের কথা নয়।
এদিকে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার সকাল থেকে লেবানন সীমান্তসংলগ্ন উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা কোনো বিশেষ বিধিনিষেধ ছাড়াই চলাচল করতে পারবেন। কয়েক মাস ধরে হিজবুল্লাহর হামলার আশঙ্কায় ওই এলাকায় নানা ধরনের নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা কার্যকর ছিল। তবে কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সেনাবাহিনী বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বর্তমানে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। যদিও ইরান এখনো জোর দিয়ে বলছে, অন্য কোনো বিষয়ে অগ্রগতির আগে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান বজায় রাখবে।
সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ডে চলমান আলোচনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে লেবানন সংকট, হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ সম্পদ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের টানাপোড়েন অব্যাহত আছে। পরিস্থিতি জটিল হলেও আলোচকরা দীর্ঘ সময় ধরে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন।