যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন এক সমঝোতার ফলে দুই দেশের চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো ৬০ দিন বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসানের পথও এই চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হতে পারে।
এক সপ্তাহ ধরে চলা নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পর এই সমঝোতা স্মারক সামনে এসেছে। এ সময় বিভিন্ন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ও পক্ষ দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চালায়। এর আগে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিভিন্ন সূত্রে এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা গেছে।
ধীরে ধীরে খুলবে হরমুজ প্রণালি
চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ধাপে ধাপে আবার চালু করা হবে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত বন্ধ ছিল। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার বলেন, শুক্রবার চুক্তি সই হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথমে সেখানে পেতে রাখা মাইন অপসারণ করা হবে। এরপর আবারও এই পথ দিয়ে উভয় দিক থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করতে পারবে।
চুক্তির আওতায় ইরান প্রণালি থেকে সব মাইন সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া যুদ্ধবিরতির অতিরিক্ত ৬০ দিনের সময়সীমায় হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল বা ফি আদায় করবে না বলেও জানিয়েছে ইরান। ট্রাম্প আরো বলেন, গত এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল, সেটিও প্রত্যাহার করা হবে। চুক্তিতে উভয় পক্ষের সামরিক হামলা বন্ধ রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ হবে। একইভাবে ইরানের উপকূলীয় লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাও বন্ধ থাকবে। ইরান থেকে বের হওয়া জাহাজ আটকানোর কার্যক্রমও স্থগিত করা হবে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজ মালিক ও শিপিং কোম্পানিগুলোকে আবার এই পথে নিয়মিত চলাচলে আস্থা ফিরে পেতে সময় লাগবে। পাশাপাশি জাহাজের বিমা খরচ কমতেও সময় লাগতে পারে।।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন প্রতিশ্রুতি
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান আবারও ঘোষণা দেবে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং ভবিষ্যতেও এমন অস্ত্র সংগ্রহ করবে না। চুক্তি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের কাছে থাকা ৯ হাজার কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা চালাবে। এ বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে। সূত্রটি আরো জানায়, অন্তত এতটুকু নিশ্চিত করা যায় যে ইরানের সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি ইরানের ভেতরেই সম্পন্ন হবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। জানা গেছে, ইরানের মজুতকৃত ইউরেনিয়ামের বেশির ভাগই নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়েছে। তবে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রার খুব কাছাকাছি।
অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে ইরান
চুক্তির অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতির বর্ধিত ৬০ দিনের সময়ে ইরানকে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রক্রিয়া একবারে হবে না। ধাপে ধাপে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে। এর মধ্যে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ছাড় করার বিষয়টিও রয়েছে। তবে এসব সুবিধা নির্ভর করবে পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয় কি না, তার ওপর। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়াকে 'কাজের ভিত্তিতে অগ্রগতি' ধরনের ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে। একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, পুরো পরিকল্পনাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ধীরে ধীরে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। তিনি বলেন, ইরান যদি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তারা অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর লক্ষ্য
চুক্তিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা নয়, পুরো অঞ্চলে সংঘাত কমিয়ে আনার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর চলমান সংঘর্ষও রয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এই উদ্যোগকে ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান- সব পক্ষই সমর্থন করবে বলে তারা আশা করছেন। তার মতে, চুক্তিটি কার্যকর করা এবং দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব হবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সবকিছুই শেষ পর্যন্ত ইরানের আচরণের ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, কোনো পক্ষই আত্মরক্ষার অধিকার ছেড়ে দেবে না। যদি ইরান চুক্তির শর্ত মেনে না চলে, তাহলে ইসরায়েল প্রতিক্রিয়া দেখাবে না- এমন আশা করার কোনো কারণ নেই।
উল্লেখ্য, ইসরায়েল এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ নয় এবং তারা এতে স্বাক্ষরও করছে না। যদিও এর আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কয়েক দফা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
এদিকে রবিবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলের নতুন হামলার ঘটনায় চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অঞ্চলটি হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে অনেকের আশঙ্কা, পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সদ্য হওয়া এই সমঝোতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।





