দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে পারেন। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তা শারীরিক সম্পর্কেও গড়াতে পারে। কিন্তু কোনো কারণে দীর্ঘদিনের সে সম্পর্ক ভেঙে গেলেই প্রেমিক পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা সংগত নয়। সব প্রেমের সম্পর্ক বিয়ের পরিণতি পাবে এমন কোনো কথা নেই এবং তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলা খারিজ করে দেওয়া রায়ে ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি একক বেঞ্চ এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দীর্ঘদিনের সম্পর্কও দুজনের মতের অমিল, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পরিপার্শ্বিক নানা কারণে তিক্ততায় পর্যবসিত হতে পারে।
বিচারপতি বিবেক কুমার সিংয়ের একক বেঞ্চ গত সপ্তাহে দেওয়া রায়ে নিম্ন আদালতে চলমান একটি মামলার সব কার্যক্রম বাতিল করে দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘আদালত এ ধরনের বিপুলসংখ্যক মামলায় লক্ষ করেছেন যে, একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি সম্মতিমূলক সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেওয়ার পর, ফৌজদারি আইন প্রয়োগ করে সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার চেষ্টা করা হয়।’
বিচারপতি বিবেক আরো বলেন, ‘একজন শিক্ষিত এবং স্বাধীনচেতা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যখন একটি সম্মতিমূলক সম্পর্কে জড়ান, তখন তাকে অবশ্যই এটি বুঝতে হবে যে কোনো সম্পর্কের কেবল ব্যর্থতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য আইনের আশ্রয় নেওয়া যায় না। একটি সম্পর্কের বিচ্ছেদ নিজে থেকে কোনো ফৌজদারি অপরাধের জন্ম দেয় না। এই ধরনের বিষয়গুলোকে সংবেদনশীলতা, সংযম এবং উভয় ব্যক্তির স্বাধীনতা ও পছন্দের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে বিবেচনা করা উচিত।’
আদালত এ ধরনের মামলাকে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অভিযোগকারী নারী ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট প্রয়াগরাজ জেলায় বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে ধর্ষণ, মারধর এবং অপরাধমূলক হুমকির অভিযোগে এফআইআর দায়ের করেছিলেন। মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর, উভয় পরিবারের সম্মতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই নারীকে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের পরও ওই নারী মামলাটি প্রত্যাহার করেননি। তার দাবি ছিল, অভিযোগ দায়েরের পর বিয়ে করলেও স্বামী তার সঙ্গে স্ত্রীর মতো আচরণ করছেন না এবং একজন বিবাহিত নারীর যে মর্যাদা পাওয়া উচিত, তা তিনি পাচ্ছেন না। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের কাছে দেওয়া তার আগের জবানবন্দিতেই অনড় থাকেন এবং তদন্ত কর্মকর্তা ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, মারধর ও অপরাধমূলক হুমকির অভিযোগে চার্জশিট জমা দেন। এরপর অভিযুক্ত স্বামী হাইকোর্টে মামলা খারিজের আবেদন করেন।
অভিযোগকারী নারী জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ২০১৪ সাল থেকে তিনি প্রয়াগরাজে ছিলেন। সেখানেই ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। কিন্তু পরে বিয়ে করতে বারবার অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি এই ধর্ষণের মামলাটি দায়ের করেন।
গত মে মাসে অনুষ্ঠিত শুনানির সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবী আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পযন্ত ৫ বছরেরও বেশি সময় তারা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্কে ছিলেন এবং এই মামলা মূলত একটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের ফল। তিনি বলেন, প্রথমবার ধর্ষণের ঘটনাটি ঠিক কোন তারিখে, সময়ে এবং স্থানে ঘটেছিল, তার কোনো উল্লেখ নেই।
আইনজীবী আরো উল্লেখ করেন যে ওই নারী উচ্চশিক্ষিত, যার এমএ, এলএলবি এবং বিএড ডিগ্রি রয়েছে।
জবাবে অভিযোগকারী নারীর আইনজীবী বলেন, পাঁচ বছর ধরে ওই নারীকে শোষণ করা হয়েছে এবং মামলা দায়েরের পর আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা পেতেই অভিযুক্ত তাকে বিয়ে করেছিলেন। এই বিয়েটি কেবল একটি প্রতারণা বা নাটক ছিল।
বিচারপতি বিবেক সিং তার রায়ে বলেন, অভিযোগকারী নারী নৈতিক ও অনৈতিক কাজের পরিণতি বোঝার মতো যথেষ্ট পরিপক্ব এবং বুদ্ধিমান ছিলেন। কোনোভাবেই এটা বলা যায় না যে, তিনি কোনো ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে শারীরিক সম্পর্কের সম্মতি দিয়েছিলেন। পাঁচ বছর ধরে চলা এই ধারাবাহিক সম্পর্ক আদালতকে নিশ্চিত করে যে, এটি স্পষ্টতই একটি প্রেমের সম্পর্ক, যা পরবর্তীতে তিক্ততায় রূপ নিয়েছে।’
বেঞ্চ তার আদেশে উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না এবং বরং ওই নারী তার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে এবং বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেই এই এফআইআর দায়ের করেছিলেন।