যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষনা দিয়েছেন কিয়ার স্টারমার। পদত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রায় ২৩ মাস লেবার পার্টি সরকারের নেতৃত্বের অবসান ঘটল স্টারমারের। তাতে গত এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে চলেছে যুক্তরাজ্য।
সোমবার (২২ জুন) ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে স্ত্রীকে পাশে নিয়ে জনসমক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির প্রধানের পদ থেকেও সরে দাঁড়াবেন।
‘সেই সঙ্গে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকব এবং সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে সাধ্যমতো সব কিছু করব’ বলে যোগ করেন তিনি।
তার বক্তব্যের সময় উপস্থিত সমর্থকরা করতালিতে তাকে বিদায় জানান। স্টারমারের এই সিদ্ধান্তের ফলে তার দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি হয়েছে।
কয়েক দিনের অনিশ্চয়তা এবং লেবার পার্টির এমপি ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের তীব্র চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করলেন স্টারমার। তবে এর আগ পর্যন্ত সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে থাকার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।
বিভিন্ন কেলেঙ্কারি এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একের পর এক পদত্যাগে অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লেও শীর্ষ পদে বহাল থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। শেষতক চাপের মুখে পদত্যাগেই বাধ্য হলেন কিয়ার স্টারমার। তার এই পদত্যাগে আগামী এক দশকে যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বড় জয় পান অ্যান্ডি বার্নহাম। এই জয়ই স্টারমারের জন্য চূড়ান্ত ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। এর পরপরই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে জটিল বিচ্ছেদ
সব কিছুর শুরু সম্ভবত ব্রেক্সিট থেকে। ২০১৬ সালের বিতর্কিত গণভোটে ব্রিটিশ ভোটাররা অল্প ব্যবধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়, যার প্রভাব এখনো অব্যাহত রয়েছে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ছয় বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল। ২০১৫ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় ক্যামেরন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুনর্নির্বাচিত হলে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ নিয়ে গণভোট আয়োজন করবেন।
কনজারভেটিভরা নির্বাচনে জয়ী হয় এবং ক্যামেরন ডাউনিং স্ট্রিটে থেকে যান। কিন্তু গণভোট তার প্রত্যাশামতো হয়নি। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকার পক্ষে ‘রিমেইন’ শিবিরে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। নির্বাচনে জয় পেলেও গণভোটে তার সমর্থিত 'রিমেইন' শিবির পরাজিত হয়।গণভোটের ফল প্রকাশের পর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।
ব্রেক্সিট কনজারভেটিভ পার্টির রাজনৈতিক ভিত্তিতেও বড় পরিবর্তন আনে। দীর্ঘদিনের অনেক সমর্থক ব্যবসাবান্ধব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে জনতাবাদী ও ব্রেক্সিটপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
একই সময়ে কনজারভেটিভদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের অনেক সমর্থক ব্রেক্সিট আন্দোলনকে সমর্থন করেন।
স্টারমার কেন পদত্যাগ করলেন
স্টারমারের পদত্যাগ আকস্মিক ছিল না। কয়েক মাস ধরে তার ওপর লেবার পার্টির ভেতরেই চাপ বাড়ছিল। তার নেতৃত্বে অসন্তুষ্ট হয়ে মধ্য-বামপন্থী দলটির আইন প্রণেতারা চাইছিলেন তিনি যেন ক্ষমতা হস্তান্তর করে দল ছেড়ে দেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে স্টারমার। তবে বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে দ্রুতই দলের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামে, যা মূলত এই অসন্তোষকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
উদারপন্থী বা লিবারেল ভোটাররা পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়ায় আরো উদ্বেগ বাড়ায় লেবার পার্টিতে। অনেক এমপি আশঙ্কা করছিলেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে নাইজেল ফারাজের দলের উত্থান লেবার পার্টির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন এবং স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছে লেবার সরকার।
স্টারমারের সরকার বিভিন্ন বিতর্কেও জড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে বিতর্ক। দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধু ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন স্টারমার। এ বিষয়ে তিনি কী জানতেন, কখন জানতেন এবং কী জানতেন না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি—এই দুটি বিষয়কে তাঁর সম্ভাব্য পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
সমালোচনা সত্ত্বেও, কিছু ক্ষেত্রে প্রশংসাও অর্জন করেছিলেন স্টারমার। তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকাগুলোর মধ্যে ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় সমর্থন জোগাড় করা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব প্রশমনের প্রচেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচনের ফলই স্টারমারের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক পার্লামেন্টের আসনের নির্বাচনে লেবার পার্টি খারাপ ফল করেছে। জনমতের সূচক হিসেবে বিবেচিত এসব নির্বাচন অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো।
লেবার পার্টির সাম্প্রতিক খারাপ নির্বাচনি ফলের কারণে দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক পদত্যাগ করেছেন এবং কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
শুরুতে স্টারমার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে লেবার পার্টির অন্তত দুজন প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী স্পষ্ট করে জানান, তারা দলীয় নেতৃত্বের জন্য তাকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন। আর পার্লামেন্টে যে দলের আসন সবচেয়ে বেশি থাকবে, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হবেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত লেবার পার্টিই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে থাকবে।
এদিকে ব্রেক্সিটের অন্যতম রূপকার এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র নাইজেল ফারাজ এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়েছেন।
দুই প্রধান দলই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা ভোটারদের সামনে নিজেকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। তার দল রিফর্ম ইউকে সাম্প্রতিক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এর মাধ্যমে দলটি ব্রিটিশ রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে মূলধারার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক দশকে ব্রিটেনে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনা দেশটির ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক আনুগত্য এবং কার্যত দুই-দলীয় ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত বহন করে। এই পরিস্থিতিতে জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে নাইজেল ফারাজ ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির আরও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসতে পারেন।
জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান মোর ইন কমনের যুক্তরাজ্য পরিচালক লুক ট্রাইল বলেন, '২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচন মূলত পরিবর্তনের পক্ষে ভোট ছিল। মানুষ বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো ও ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি। আর এ কারণেই রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত আছে।’
স্টারমারের উত্তরসূরি কে হবেন
লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহামকে স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বার্নহাম মেয়রের দায়িত্ব ছেড়ে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেইকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের আসন নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ সুগম করেছেন।
এ ছাড়া ওয়েস স্ট্রিটিংও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারেন। প্রার্থী হতে হলে ৮১ জন লেবার পার্টির সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। এরপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচন হতে পারে। তবে সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রী
২০১৬ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। গড়ে প্রতি দেড় থেকে দুই বছর পরপরই নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে।
ডেভিড ক্যামেরন ২০১৬ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি ব্রেক্সিট ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ছিলেন। তবে গণভোটে পরাজিত হন। তেরেসা মে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে ব্যর্থ হন তিনি। বরিস জনসন ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। একাধিক কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক চাপ তাকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। লিজ ট্রাস ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। তিনি মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ঋষি সুনাক ২০২৪ সালে ক্ষমতা ছাড়েন। সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।
সর্বশেষ পদত্যাগ করলেন কিয়ার স্টারমার।




