ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের (নন-ইইউ) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার খবর এসেছে। দেশটির সরকার আবাসন সহায়তা নীতিতে পরিবর্তন এনে নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে সরকারি আবাসন ভাতা কর্মসূচির বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আগামী দিনে ফ্রান্সে পড়তে যাওয়া বহু শিক্ষার্থীর মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
ফরাসি সরকারের ঘোষিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকা (ইইএ) ও সুইজারল্যান্ডের বাইরের যেসব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সামাজিক মানদণ্ডভিত্তিক বৃত্তি পান না, তারা আর আগের মতো আবাসন ভাতা পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। এতদিন ফ্রান্সে পড়তে যাওয়া বহু বিদেশি শিক্ষার্থী বাসাভাড়ার একটি অংশ সরকারি সহায়তা হিসেবে পেতেন, যা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি এনে দিত। নতুন নীতি কার্যকর হওয়ায় সেই সুবিধা হারিয়ে তাদের মাসিক খরচে বাড়তি চাপ পড়বে।
ফরাসি সরকারের ভাষ্য, সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করা এবং সরকারি ব্যয় প্রকৃত প্রয়োজনভিত্তিক খাতে কেন্দ্রীভূত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমিত সম্পদ বেশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
তবে নতুন নিয়ম সবার ক্ষেত্রে একভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে না। ইইউ, ইইএ ও সুইজারল্যান্ডভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীরা আগের মতোই আবাসন সহায়তার আওতায় থাকবেন। একই সঙ্গে সামাজিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী, শরণার্থী মর্যাদাপ্রাপ্ত বা রাষ্ট্রহীন শিক্ষার্থী এবং কিছু নির্দিষ্ট পারিবারিক বা সামাজিক অবস্থার আওতায় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তার সুযোগ বহাল থাকতে পারে। অর্থাৎ, নীতিগত কড়াকড়ি মূলত সেসব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে, যারা নিজস্ব অর্থায়নে ফ্রান্সে পড়তে যান এবং কোনো বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়েন না।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের ওপর। কারণ এসব দেশের অনেক শিক্ষার্থী পারিবারিক বা ব্যক্তিগত অর্থায়নে ফ্রান্সে পড়তে যান এবং আবাসন ব্যয় সামাল দিতে সরকারি সহায়তার ওপর আংশিকভাবে নির্ভরশীল থাকেন। বিশেষ করে প্যারিস, লিওঁ, তুলুজ, লিল বা বোর্দোর মতো শহরে ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় নতুন নীতির আর্থিক অভিঘাত আরো বেশি অনুভূত হতে পারে।
ফ্রান্সে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ব্যয় সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি তুলনামূলক সহনীয় হলেও বাসাভাড়া, পরিবহন, স্বাস্থ্যবিমা, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মিলিয়ে মাসিক বাজেট অনেক শিক্ষার্থীর জন্য চাপের হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে আবাসন ভাতা অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করত। ফলে এই সহায়তা সীমিত হয়ে যাওয়ায় নতুন শিক্ষার্থীদের ফ্রান্সে যাওয়ার আগে আগের চেয়ে বেশি আর্থিক প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিকল্প গন্তব্য হিসেবেও অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিবেচনায় নিতে পারেন। কারণ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে আবাসন খরচ, উচ্চশিক্ষা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠবে।
তবে ফরাসি সরকার জানিয়েছে, আবাসন ভাতার নিয়মে পরিবর্তন এলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রুস পরিচালিত আবাসন, স্বল্পমূল্যের খাবার এবং অন্যান্য সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি চালু থাকবে। ফলে আবাসন ভাতায় কড়াকড়ি এলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান সব ধরনের সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। তবু নতুন বাস্তবতায় ফ্রান্সে পড়তে আগ্রহী নন -ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি আর্থিক পরিকল্পনা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।




