ফুটবল বিশ্বে এর চেয়ে বড় বা নিয়মিত দ্বৈরথ হয়তো আরও আছে। হয়তো আছে এর চেয়েও তেড়েফুঁড়ে আসা চিরচেনা লোকাল ডার্বি। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে রাজনৈতিক বৈরিতা, ফুটবলের আদি ও অকৃত্রিম মিথলজি এবং আবেগের এমন বারুদ আর কোনো ম্যাচে দেখা যায়নি, যা জমা হয়ে আছে একেকটি ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ফুটবল যুদ্ধের খেরোখাতায়।
এই শত্রুতার শিকড় শুধু সবুজ ঘাসের মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিস্তৃত ইতিহাসের পাতায়। ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালে রিও দে লা প্লাতায় ব্রিটিশদের ব্যর্থ আগ্রাসন এবং তার প্রায় দুই শতাব্দী পর ১৯৮২ সালের রক্তক্ষয়ী ‘ফকল্যান্ডস যুদ্ধ’—এই দুই দেশের যেকোনো ম্যাচকে শুধু একটি খেলার গণ্ডি থেকে বের করে রূপ দিয়েছে মর্যাদার লড়াইয়ে।
তার ওপর ফুটবলীয় নাটকীয়তা যখন এর সঙ্গে যোগ হয়, তখন একে অনেকেই অভিহিত করেন ফুটবল বিশ্বকাপের একমাত্র ‘আন্তঃমহাদেশীয় ডার্বি’ হিসেবে। বিশ্বমঞ্চে এখন পর্যন্ত পাঁচবারের দেখায় ৩ বার জিতেছে থ্রি-লায়ন্সরা, আর ২ বার শেষ হাসি হেসেছে আলবিসেলেস্তেরা (যার একটি টাইব্রেকারে)। তবে কেবল এই সংখ্যা দিয়ে দুই পরাশক্তির মাঠের ভেতরের ও বাইরের উত্তাপ পরিমাপ করা অসম্ভব।
ইতিহাস, রাজনীতি, আত্মপরিচয় আর ফুটবলের চরম নাটকীয়তার এক অদ্ভুত মিশেল এই দ্বৈরথ। এখানে আছে রেফারিং নিয়ে তুমুল বিতর্ক, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ‘হ্যান্ডবল’, আবার একই ম্যাচে শতাব্দীর সেরা একক গোল! আছে এক তরুণের বিশ্বজয়ের হুঙ্কার, আবার খলনায়ক থেকে এক অধিনায়কের বীরের বেশে ফেরার গল্পও। অথচ, ১৯৬২ সালে এই দ্বৈরথের সূচনাটা হয়েছিল বেশ শান্তভাবেই।
ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা (গ্রুপ পর্ব, ১৯৬২)
বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দলের প্রথম দেখা। পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক তিক্ততা এই ম্যাচকে গ্রাস করেছিল, ১৯৬২ সালের ম্যাচে তা ছিল না। তবে মাঠের লড়াইয়ে উত্তেজনার কমতি ছিল না মোটেও। রন ফ্লাওয়ার্স, ববি চার্লটন ও জিমি গ্রিভসের গোলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচ একপ্রকার পকেটে পুরে নেয় ইংল্যান্ড। শেষদিকে আর্জেন্টিনার হোসে সানফিলিপো কেবল একটি গোল শোধ করে ব্যবধানই কমাতে পেরেছিলেন। এই জয়টি ইংল্যান্ডের জন্য এতটাই ভাগ্যনির্ধারক ছিল যে, গোল ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে পেছনে ফেলে তারা কোয়ার্টার-ফাইনালে পা রাখে এবং লাতিন আমেরিকার দলটিকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। সেই সময়ে এটি সাধারণ একটি গ্রুপ পর্বের জয় মনে হলেও, ইতিহাস বলছে, এটিই ছিল ফুটবলের অন্যতম চিরন্তন এক দ্বৈরথের মহাকাব্যিক সূচনা।
ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা (কোয়ার্টার-ফাইনাল, ১৯৬৬)
ঠিক চার বছর পরের ম্যাচেই দুই দেশের ফুটবলীয় সুসম্পর্ক রূপ নেয় চরম বৈরিতায়। সেবার ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের মিশন ছিল ইংলিশদের। ওয়েম্বলিতে কোয়ার্টার-ফাইনালের সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা ছিলেন রুদ্রমূর্তি। ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তটি আসে যখন ভাষার প্রাচীর থাকা সত্ত্বেও জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে মাঠ ছাড়ার (লাল কার্ড) নির্দেশ দেন, কথিত আছে—অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য। কিন্তু রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ এসে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়।
জিওফ হার্স্টের শেষদিকের এক বুলেট হেডারে ম্যাচ জেতে ইংল্যান্ড। তবে বিতর্ক থামেনি। আর্জেন্টিনার দাবি ছিল, স্বাগতিকদের সুবিধা দিতেই রেফারি পক্ষপাতিত্ব করেছেন। ওয়েম্বলির সেই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পরই ফিফা পরবর্তী বিশ্বকাপ থেকে ফুটবলারদের সতর্ক করতে হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম চালু করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, এই এক ম্যাচ বদলে দিয়েছিল দুই দলের সম্পর্ক এবং ফুটবলের চিরন্তন নিয়মকে!
আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (কোয়ার্টার-ফাইনাল, ১৯৮৬)
বিশ্বকাপের ইতিহাসে একই ম্যাচে এত বিপরীতমুখী এবং চিরস্মরণীয় দুটি গোল আর কখনো দেখেনি ফুটবল বিশ্ব। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ক্ষত তখনো দুই দেশের মানুষের মনে টাটকা। মেক্সিকো সিটির সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে হাত দিয়ে বল জালে জড়ান, যা পরবর্তীতে ম্যারাডোনা নিজেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেন ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ হিসেবে। ইংলিশ ডিফেন্ডারদের আকাশ কাঁপানো প্রতিবাদ সেদিন রেফারির কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
তবে সেই কুখ্যাত গোলের ঠিক চার মিনিট পর ম্যারাডোনা দেখান ভিন্ন রূপ। নিজের রক্ষণভাগ থেকে বল নিয়ে একক নৈপুণ্যে অর্ধেক ইংলিশ দলকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে করেন শতাব্দীর সেরা গোল। প্রথম গোলটি যদি চাতুর্যের প্রতীক হয়, তবে দ্বিতীয়টি ছিল নিখাদ জাদুকরি প্রতিভা। শেষ মুহূর্তে গ্যারি লিনেকারের হেড ব্যবধান কমালেও তা আর্জেন্টিনার জয় রুখতে পারেনি। জন বার্নসের ক্রস থেকে লিনেকার আরেকটি গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার শেষ মুহূর্তে বল ক্লিয়ার করলে সমতায় ফেরার শেষ সুযোগ হারায় ইংল্যান্ড। ম্যাচ জিতে সেবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাই।
আর্জেন্টিনা ২-২ ইংল্যান্ড (টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে আর্জেন্টিনা জয়ী, শেষ ষোলো, ১৯৯৮)
১৯৮৬ সাল যদি ম্যারাডোনার হয়, তবে ফ্রান্সের ’৯৮ বিশ্বকাপ ছিল এক চরম নাটকীয়তার মঞ্চ। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও অ্যালান শিয়ারারের পেনাল্টি গোলের পর, মাত্র ১৮ বছর বয়সী তরুণ মাইকেল ওয়েন মাঝমাঠ থেকে এক অবিশ্বাস্য একক দৌড়ে গোল করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা জানান। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে হাভিয়ের জানেত্তির এক চতুর ফ্রি-কিক কৌশলে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা।
এরপরই ঘটে ম্যাচের সেই মূল নাটক। ডিয়েগো সিমিওনে ইংলিশ তারকা ডেভিড বেকহ্যামকে ফাউল করে মাটিতে ফেলে দেন। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় বেকহ্যাম আলতো করে লাথি মারেন সিমিওনেকে। সিমিওনে মাঠে এমন নাটুকে অভিনয় করে লুটিয়ে পড়েন যে রেফারি কিম মিল্টন নিলসেন সরাসরি লাল কার্ড দেখান বেকহ্যামকে। ১০ জনের দল নিয়ে টাইব্রেকার পর্যন্ত বুক চিতিয়ে লড়াই করলেও শেষরক্ষা হয়নি ইংলিশদের। ডেভিড ব্যাটির মিস করা পেনাল্টিতে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড, আর দেশে ফিরে বেকহ্যাম বনে যান পুরো জাতির ‘খলনায়ক’।
আর্জেন্টিনা ০-১ ইংল্যান্ড (গ্রুপ পর্ব, ২০০২)
ফুটবল সবসময় খলনায়কদের নায়ক হওয়ার সুযোগ দেয় না, কিন্তু ২০০২ সালে ডেভিড বেকহ্যাম সেই সুযোগ লুফে নিয়েছিলেন রাজকীয়ভাবে। ১৯৯৮ সালের সেন্ট-এতিয়েনের সেই অভিশপ্ত রাতের চার বছর পর, স্যাপোরো ডোমে ইংলিশ অধিনায়ক নিজের ভাগ্যলিপি নতুন করে লেখেন। প্রথমার্ধের ঠিক আগে মাইকেল ওয়েনকে ডিবক্সের ভেতর ফাউল করেন মরিসিও পচেত্তিনো। পেনাল্টি শট নিতে আসেন বেকহ্যাম। বুকভরা চাপ নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়েই বুনো উল্লাসে মাতেন তিনি।
কোচ সভেন-গোরান এরিকসনের অধীনে এরপর ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগে আর্জেন্টিনাকে আটকে রেখে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। আর আসরের হট ফেভারিট হয়েও সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
আজ রাতে আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখে যাবে এই দুই দলের দ্বৈরথ। ইতিহাস যাই বলুক না কেন বর্তমানের ভাগ্য যার দিকে যাবে তারাই খেলবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল।




