মাঠের লড়াইয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় তো একটা ধাক্কা ছিলই, কিন্তু পর্দার আড়ালের যে সত্যটি এবার সামনে এল, তা রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্বকে। ফুটবলীয় পরাশক্তি জার্মানির এমন ভরাডুবির পেছনে কাজ করেছে দলের ভেতরকার চরম আত্মবিশ্বাসের অভাব আর বড় মঞ্চে দায়িত্ব এড়ানোর মানসিকতা।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় থাকার পর টাইব্রেকারের লটারিতেই কপাল পোড়ে ডাই মানশাফটদের।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান তাহ-এর একটি দর্শনীয় হেডার গোল ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির বেড়াজালে আটকে বাতিল হলে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। সেখানে প্রথম পাঁচটি করে শটে স্কোর ৩-৩ সমতায় থাকার পর শুরু হয় স্নায়ুক্ষয়ী ‘সাডেন ডেথ’। আর এই সাডেন ডেথেই জার্মানির বর্তমান দলটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়ে।
বিখ্যাত জার্মান গণমাধ্যম ‘বিল্ড’ এক প্রতিবেদনে ড্রেসিংরুমের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে। তাদের দাবি, টাইব্রেকারে প্রথম পাঁচটি শট শেষে যখন সাডেন ডেথ শুরু হয়, তখন জার্মানির অন্তত চারজন প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার ষষ্ঠ শটটি নিতে সাফ অস্বীকৃতি জানান! চাপের মুখে বুক কাঁপতে থাকা সেই চার সতীর্থের অনীহার পর বাধ্য হয়েই শেষ পর্যন্ত সেই কঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন ডিফেন্ডার জোনাথন তাহ।
অথচ বিশ্বকাপের শুরুটা কী দুর্দান্তই না করেছিল জার্মানি! নিজেদের প্রথম ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শক্তির জানান দিয়েছিল তারা। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়ের পর থেকেই দলের ফাটলগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। গ্রুপ ‘ই’-এর শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে ২-১ গোলে হেরে নকআউটে পা রাখে নাগেলসম্যানের দল।
শেষ ৩২-এর মঞ্চে প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণের সামনে অতিরিক্ত সময়েও যখন সমাধান মেলেনি, তখন ভাগ্য নির্ধারণের ভার যায় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে প্রথম ১০টি শটের পর দুই দলের স্কোর যখন ৩-৩, তখনই আসে সেই নাটকীয় মোড়। জার্মানির হয়ে ষষ্ঠ শট নিতে এগিয়ে আসেন তাহ। জাতীয় দলের জার্সিতে এটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের প্রথম পেনাল্টি শট! আর এমন অতি-চাপের ম্যাচে অভিজ্ঞতার অভাবটাই কাল হলো; লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নিয়ে বসেন তাহ। এরপর প্যারাগুয়ে নিজেদের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইতিহাস গড়ে উল্লাসে মাতে।
প্রতিবেদনে জানা গেছে, তাহ মূলত স্পট কিকে এসেছিলেন বাধ্য হয়ে। তার আগে লিওন গোরেৎসকা, ভালডেমার আন্তন, নাথানিয়েল ব্রাউন ও মালিক থিয়াওয়ের মতো চার তারকা পেনাল্টি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। সাডেন ডেথের চরম মুহূর্তে তারা কেউই শট নেওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারেননি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে লিওন গোরেৎসকাকে নিয়ে। ৭২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারকে স্বয়ং অধিনায়ক যশুয়া কিমিখ দুইবার পেনাল্টি নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও তিনি এগিয়ে আসেননি। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ মৌসুম শেষে বায়ার্ন মিউনিখ ছাড়া এই অভিজ্ঞ তারকার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে ফুটবল মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়।
শেষ পর্যন্ত কাই হাভার্টজ, নিক ভল্টেমাডে এবং জোনাথন তাহ—এই তিনজনের পেনাল্টি মিসের খেসারত দিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয় জার্মানির। এই লজ্জার হারে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট কাটতে ব্যর্থ হয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।




