২০১৬ সালে ভাঙা হৃদয়ে জাতীয় দলকে বিদায় বলেছিলেন লিওনেল মেসি। কোপা আমেরিকার আরেকটি ফাইনাল হার, সমালোচনা আর অপূর্ণতার যন্ত্রণায় মনে হয়েছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর গল্প শেষ।
কিন্তু ফুটবল যেন তাঁর জন্য অন্য এক চিত্রনাট্যই লিখে রেখেছিল। ঠিক এক দশক পর, ৩৯তম জন্মদিনে সেই মেসিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। অবসর থেকে ফিরে এসে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসও।
২০১৬ সালের সেই রাতে চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর মেসি বলেছিলেন, ‘আমার জন্য জাতীয় দল শেষ। আমি সবকিছু দিয়েছি। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার কষ্টটা খুব বেশি।’ তখন হয়তো তিনিও কল্পনা করতে পারেননি, একদিন তাঁর জাতীয় দলের ক্যারিয়ার এমন উচ্চতায় পৌঁছবে। অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে ফেরার পর শুরু হয় আর্জেন্টিনা ও মেসির স্বর্ণযুগ।
টানা দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপার পর ২০২২-এ বিশ্বকাপ জয় এবং আরেকটি বিশ্বকাপে রেকর্ড ভাঙার নতুন ইতিহাস। গত পরশু অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়েও জোড়া গোল মেসির। ম্যাচের শুরুটা অবশ্য তাঁর জন্য সুখকর ছিল না। পেনাল্টি মিস করে হতাশায় মুখও লুকাতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু মেসি আরেকবার প্রমাণ করেছেন তিনি কেন সবার সেরা।
তাঁর গল্প যে শেষ হওয়ার নয়, সেটিই যেন আবারও দেখালেন তিনি। মহাতারকারা যে হতাশার পর মহাদর্পে ফিরে আসে, তারই প্রমাণ রাখেন দুই অর্ধে দুইটি গোল করে। তাতে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে ১৮ গোল নিয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক এখন সবার ওপরে। শেষ মিনিটে মেসি যখন অস্ট্রিয়ার জালে আবার বল পাঠালেন, বিবিসি ধারাভাষ্যকার স্টিভ বাওয়া তখন বলছিলেন, ‘মেসির আরেক অমর মুহূর্ত।’
ম্যাচ শেষে মেসির কণ্ঠেও ছিল তৃপ্তি আর প্রশান্তির সুর, ‘আমি খেলাটা উপভোগ করছি, মাঠে আনন্দ করছি। মানুষকে এভাবে খুশি করতে পারাটাও আমাদের জন্য আনন্দের।’ বিশ্বকাপে এখন ২৮ ম্যাচে তাঁর গোল ১৮টি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ জর্দানের বিপক্ষে, এরপর নক আউট পর্ব। তাই গোলের এই সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন ফুটবলবিশ্বের কৌতূহলের অন্যতম বিষয়। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা মেসি তাঁর ১৮ গোলের মধ্যে ১৩টিই করেছেন ২০১৬ সালে অবসর ভেঙে ফেরার পর। আর ১২টি গোল করেছেন ৩৫ বছর বয়স পার হওয়ার পর। যা অবিশ্বাস্য।
এই বয়সেও মেসি ছাপিয়ে গেছেন তরুণ ও সেরা সময়ের খেলোয়াড়দের। যে বয়সে বেশির ভাগ ফুটবলার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে যান, সেই বয়সেই মেসি লিখছেন নতুন নতুন মহাকাব্য। গোল করছেন। রেকর্ড ভাঙছেন। ইতিহাস বদলে দিচ্ছেন। স্প্যানিশ ক্রীড়া সাংবাদিক গুয়েম বালাগে তাই বলেছেন, ‘মেসিকে নিয়ে বিশ্লেষণ করা বা তাঁর জন্য মূর্তি বানানোর সময়ই নেই। তিনি এত দ্রুত নতুন ইতিহাস গড়ছেন যে তাঁর সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন।’
বালাগের মতে, বয়স মেসিকে থামায়নি বরং আরো পরিণত করেছে, ‘আগের বিশ্বকাপগুলোতে এমন ম্যাচও দেখেছি, যেখানে ৯০ মিনিট খেলতে তাঁর কষ্ট হতো। এখন ম্যাচের শেষ মুহূর্তেও তিনি অন্যদের মতোই দৌড়াচ্ছেন। নিজের শরীরকে তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো বোঝেন। মেসির গতির প্রয়োজন নেই, তিনি বুদ্ধিমত্তা দিয়েই ডিফেন্ডারদের হারিয়ে দেন।’
এক দশক আগে যে মানুষটি হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েছিলেন, সেই তিনিই এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ফুটবলে প্রত্যাবর্তনের অনেক গল্প আছে। কিন্তু অবসর থেকে ফিরে এসে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হয়ে ওঠার গল্প সম্ভবত একটিই। আর সেই গল্পের নাম লিওনেল মেসি।